ফেসবুক ভিডিও ভাইরাল
ঝামেলা হলে জনবিস্ফোরণের হুঁশিয়ারি র্যাব কর্মকর্তা হত্যার আসামির
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানের নামে ঢালাওভাবে গ্রেফতার করতে দেয়া হবে না—এমন হুঁশিয়ারির সঙ্গে ‘জনবিস্ফোরণ’ ঘটার আশঙ্কার কথা বলেছেন র্যাব কর্মকর্তা হত্যা মামলার প্রধান আসামি মোহাম্মদ ইয়াসিন। তিনি দাবি করেন, কাউকে ধরতে হলে অভিযানের আগে আসামির নাম-ঠিকানা জানাতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
ইয়াসিনের এসব বক্তব্যের একটি ভিডিও বৃহস্পতিবার সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এর আগের দিন বুধবার বিকেলে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগরে নিজের কার্যালয়ে প্রায় ২৯ মিনিট ধরে এ বক্তব্য দেন তিনি।
ভিডিওতে ইয়াসিন নিজেকে সন্ত্রাসী নন বলে দাবি করেন এবং বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের জমি তাদের ক্রয় করা সম্পত্তি। সেখান থেকে কাউকে উচ্ছেদ করার ক্ষমতা কারও নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার বক্তব্যে সাবেক এক জেলা প্রশাসকের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে সে কর্মকর্তাই এখন উধাও হয়ে গেছেন।
বক্তব্যে একাধিকবার ‘জনবিস্ফোরণ’-এর হুঁশিয়ারি দেন ইয়াসিন। তিনি বলেন, অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা ঘটলে এলাকায় বড় ধরনের জনবিস্ফোরণ হতে পারে এবং এর দায় প্রশাসনকে নিতে হবে। পাশাপাশি তিনি জঙ্গল সলিমপুরে গত সোমবার পরিচালিত র্যাবের অভিযানের উদ্দেশ্য ও স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। কেন র্যাব সেখানে অভিযান চালিয়েছে, তা তদন্ত করার দাবি জানান তিনি।
ইয়াসিন তার বক্তব্যে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক (বহিষ্কৃত) রোকন উদ্দিনকে জঙ্গল সলিমপুরে অস্থিরতার জন্য দায়ী করেন। দাবি করেন, রোকন উদ্দিনের পেছনে রাজনৈতিক ‘খুঁটির জোর’ রয়েছে।
প্রসঙ্গত, সোমবার বিকেল চারটার দিকে জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের অভিযানের সময় সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। এ ঘটনায় বুধবার রাতে সীতাকুণ্ড থানায় র্যাব একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। মামলায় মোহাম্মদ ইয়াসিনকে প্রধান আসামি করে নুরুল হক ভান্ডারীসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, আসামি ধরতে গেলে মোহাম্মদ ইয়াসিনের নির্দেশে রামদা, কিরিচ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় র্যাবের হাতে আটক এক আসামিকে ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং চারজন র্যাব সদস্যকে অপহরণ করা হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করা হয়।
জঙ্গল সলিমপুর চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে অবস্থিত। প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর আয়তনের এ এলাকা সীতাকুণ্ড উপজেলায় হলেও নগরের একেবারে সন্নিকটে। এর পূর্বে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ বোস্তামী থানা।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। চার দশকের বেশি সময় ধরে সরকারি পাহাড় কেটে এখানে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এখনও চলছে পাহাড় কেটে প্লট-বাণিজ্য। এ দখল ও বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে উঠেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী, যারা সার্বক্ষণিক পাহারা দিয়ে থাকে।
এর আগেও জঙ্গল সলিমপুরে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের অক্টোবরে দুটি সন্ত্রাসী পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত হন। পরদিন সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।
পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দুটি সন্ত্রাসী পক্ষ সক্রিয়। একটির নেতৃত্বে মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অপরটির নেতৃত্বে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সীতাকুণ্ডের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম আল মামুনের অনুসারী ছিলেন। ভাইরাল ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, রোকন উদ্দিন বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুসারী। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইয়াসিন নিজেও আসলাম চৌধুরীর অনুসারী দাবি করে আসছেন। এ বিষয়ে মঙ্গলবার গণমাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে আসলাম চৌধুরী বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে তার কোনও অনুসারী নেই এবং ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িত নন।
ইয়াসিনের হুঁশিয়ারি সম্পর্কে জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলাম বলেন, ইয়াসিন তার আলীনগরের কার্যালয়ে বসে এসব বক্তব্য দিয়েছেন এবং তাকে গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
র্যাবের অভিযানের বিষয়ে সংস্থাটির মহাপরিচালক এ কে এম শহীদুর রহমান বলেন, অভিযানে ৫০ জনের বেশি র্যাব সদস্য অংশ নেন। সফলভাবে অভিযান সম্পন্ন করা যাবে—এ ধারণা থেকেই তারা সেখানে যান। অভিযানে কোনও ত্রুটি ছিলো কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























