তীব্র আইনি বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড়
ট্রাম্পকে ৪০ কোটি ডলারের বিমান উপহার দিলো কাতার
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য কাতারের উপহার হিসেবে পাওয়া ৪০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের বিলাসবহুল বোয়িং ৭৪৭ বিমানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক ও সমালোচনা।
প্রায় তিন দশক ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের বহনকারী ঐতিহাসিক বিমানটির বিদায়ের পরদিনই নতুন এ সাময়িক ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ উন্মোচন করা হয়। তবে উন্মোচনের আনন্দকে ছাপিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিমানটির উৎস, ব্যয় এবং এর রাজনৈতিক তাৎপর্য।
শুক্রবার (১৯ জুন) মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নতুন প্রেসিডেন্সিয়াল বিমানটির আনুষ্ঠানিক উন্মোচন করা হয়। ‘ভিসি-২৫বি ব্রিজ’ নামে পরিচিত বিমানটি গাঢ় লাল, সাদা, গাঢ় নীল ও সোনালি রঙে সাজানো হয়েছে, যা অনেকটা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বিমানের রঙের আদলে তৈরি।
তবে বিমানটি নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী রাজনীতিক ও নীতিনির্ধারকরা। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিকতা ও সরকারি আচরণবিধি অনুযায়ী কোনও সরকারি কর্মকর্তা একই উৎস থেকে বছরে ৫০ ডলারের বেশি মূল্যের উপহার গ্রহণ করতে পারেন না। সেখানে একটি বিদেশি সরকারের কাছ থেকে ৪০ কোটি ডলারের বিমান গ্রহণ আইনি ও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
সমালোচনার জবাবে ট্রাম্প বলেন, এমন একটি প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়া বোকামির শামিল। তিনি কাতারের আমিরের প্রশংসা করে বলেন, তিনি একজন অসাধারণ ব্যক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভালো বন্ধু। ট্রাম্পের ভাষায়, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বিলাসবহুল বিমানগুলোর একটি। এমন মানের বিমান এখন আর তৈরি হয় না বললেই চলে।
অন্যদিকে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, বিমানটি গ্রহণের ক্ষেত্রে সব ধরনের ফেডারেল আইন ও প্রশাসনিক বিধি অনুসরণ করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি আইনি কাঠামোর মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে।
তবে উপহার পাওয়া বিমানটিকে প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতেই ব্যয় হয়েছে আরও প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যোগাযোগ প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং প্রেসিডেন্সিয়াল মানদণ্ডে উন্নীত করতে এ বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। ফলে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন, একটি তথাকথিত ‘উপহার’ বিমান শেষ পর্যন্ত করদাতাদের জন্য কতটা ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মূলত নতুন প্রজন্মের প্রেসিডেন্সিয়াল বিমান সরবরাহে বিলম্ব হওয়ায় এ কাতারি জেটকে অন্তর্বর্তীকালীন সমাধান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০২৭ ও ২০২৮ সালে নতুন দুটি ভিসি-২৫বি বিমান সরবরাহের কথা থাকলেও নির্মাণ বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পটি জটিলতায় পড়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্প ব্যয় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
সমালোচকদের আরেকটি অভিযোগ হলো, এ বিমান আধুনিকীকরণে ব্যয় হওয়া অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা প্রকল্পগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ‘সেন্টিনেল’-এর বাজেটের ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
বর্তমান প্রেসিডেন্সিয়াল বহরে থাকা দুটি বিমান ১৯৯০ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের আমলে যুক্ত হয়েছিলো। দীর্ঘ ব্যবহারের কারণে বিমানগুলোতে যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে সুইজারল্যান্ডের দাভোস সফরের পথে একটি বিমানে বৈদ্যুতিক ত্রুটি দেখা দিলে মাঝপথ থেকেই ওয়াশিংটনে ফিরে যেতে বাধ্য হন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ওই ঘটনার পর নতুন বিকল্প বিমান প্রস্তুতের কাজ দ্রুততর করা হয়।
বিমান বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দ্রুত হস্তান্তরের স্বার্থে নতুন বিমানে কিছু পরিকল্পিত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বাদ দেয়া হয়েছে। তবে নিরাপত্তা ও অপারেশনাল সক্ষমতার ক্ষেত্রে কোনও ধরনের ছাড় দেয়া হয়নি।
নতুন এ বিমানটি আগামী ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী উদযাপনের বিশেষ ফ্লাইওভারে নেতৃত্ব দেবে। ট্রাম্প একে আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম বড় আকাশ প্রদর্শনী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিয়াল মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিমানটি ব্যক্তিগত ব্যবহারে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। যদিও বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘণ্টায় প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ডলার পরিচালন ব্যয়ের কারণে এ বিশাল জেট ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। তুলনামূলকভাবে ট্রাম্পের নিজস্ব বোয়িং ৭৫৭ বিমানের পরিচালন ব্যয় অনেক কম।
সব মিলিয়ে কাতারের উপহার হিসেবে পাওয়া বিলাসবহুল বিমানটি এখন শুধু একটি প্রেসিডেন্সিয়াল বাহন নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক নৈতিকতা, সরকারি ব্যয় এবং বিদেশি প্রভাব নিয়ে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
সবার দেশ/কেএম




























