দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ‘ফাঁদ’ তেহরানের
ইরানের ড্রোন হামলায় দিশেহারা যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত ক্রমেই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সস্তা আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ভারসাম্যে চাপ তৈরি করার কৌশল নিয়েছে ইরান, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সংঘাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, ইরানের ড্রোন হামলা মোকাবিলায় বিপুল ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে। মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঝাঁকে ঝাঁকে আসা ড্রোন সম্পূর্ণভাবে প্রতিহত করা কঠিন। তাই ড্রোন উৎক্ষেপণস্থল দ্রুত ধ্বংস করার কৌশলের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানে তৈরি একটি আত্মঘাতী ড্রোনের ব্যয় প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার ডলার। কিন্তু সে ড্রোন ভূপাতিত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে যে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়, তার প্রতিটির মূল্য প্রায় ২০ থেকে ৪০ লাখ ডলার। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত অর্থনৈতিক যুদ্ধের একটি নতুন কৌশল, যেখানে প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী পক্ষও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হতাহতের সংখ্যাও বাড়ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে। গত ছয় দিনে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১২৫০ জন নিহত হয়েছে বলে কিছু প্রতিবেদনে বলা হলেও স্বাধীনভাবে এ তথ্য যাচাই করা যায়নি। অন্যদিকে ইরানের পালটা হামলায় ইসরায়েলে ১১ জন এবং কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ৬ জন সেনা নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া পারস্য উপসাগর অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আরও কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছেন।
ইরান দাবি করছে, তাদের হামলার লক্ষ্য কেবল সামরিক স্থাপনা। তবে ইসরায়েল ও পশ্চিমা দেশগুলো অভিযোগ করছে, ইরানের হামলায় বেসামরিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি এলাকায় নৌপথের নিরাপত্তা বড় সংকটে পড়েছে। আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থা জানিয়েছে, ওই প্রণালিতে প্রায় ২০ হাজার নাবিক এবং বিভিন্ন ক্রুজ জাহাজের প্রায় ১৫ হাজার যাত্রী আটকা পড়েছেন, যার ফলে বাণিজ্যিক নৌ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
ইরান জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের মিত্র দেশের সামরিক এবং বাণিজ্যিক জাহাজকে তারা লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করবে। Islamic Revolutionary Guard Corps (আইআরজিসি) বলেছে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তারা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অধিকার রাখে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান বর্তমানে হাজার হাজার একবার ব্যবহারযোগ্য আত্মঘাতী ড্রোন মোতায়েন করেছে। United States Department of Defense–এর এক শীর্ষ কর্মকর্তা আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছেন, সব ড্রোন ধ্বংস করা সম্ভব নয়। তাই উৎক্ষেপণস্থল ধ্বংস করাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান অভিযানের বিষয়ে কংগ্রেসে বিতর্ক হয়েছে। যুদ্ধ সীমিত করার প্রস্তাব সিনেটে ভোটে নাকচ হয়ে গেছে, যেখানে ১০০ সদস্যের মধ্যে ৫২ জন প্রস্তাবের বিপক্ষে এবং ৪৭ জন পক্ষে ভোট দেন।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্য মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। দেশটি কাতারে মোতায়েন স্কোয়াড্রনে যোগ দিতে আরও চারটি Eurofighter Typhoon যুদ্ধবিমান পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে অষ্ট্রেলিয়াও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাত কেবল সামরিক নয়, বরং অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার রূপ নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
সবার দেশ/কেএম




























