প্রাণ বাঁচাতে রাজ্য ছেড়ে পালাচ্ছে মুসলিম শ্রমিকরা
ভারতে ‘বাংলাদেশি’ তকমায় হিন্দুত্ববাদী জঙ্গিদের ব্যাপক নৃশংসতা
উত্তর চাচণ্ড গ্রামের হকার নজরুল ইসলাম বলেন, গেরুয়া পোশাক পরা কয়েকজন এসে আমার ভাড়াবাড়িতে ঢুকে ধর্ম, খাবার আর বাড়ির ঠিকানা জানতে চায়। জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ ও ‘জয় গোমাতা’ বলাতে বাধ্য করে এবং রাজ্য ছাড়ার হুমকি দেয়। প্রাণভয়ে পরদিনই ট্রেনে উঠে বাড়ি ফিরেছি।
ভারতের ওড়িশা রাজ্যে হিন্দুত্ববাদী উগ্র গোষ্ঠীর সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজ্যটিতে বসবাস বা কাজ করতে গিয়ে এখন আর কোনো অপরাধের প্রয়োজন পড়ছে না—বাংলাভাষী মুসলিম হলেই ‘বাংলাদেশি’ বা ‘রোহিঙ্গা’ তকমা দিয়ে প্রকাশ্যে হেনস্থা, মারধর এমনকি হত্যার শিকার হতে হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের।
এ আতঙ্কের পরিবেশে প্রাণ বাঁচাতে দলে দলে ওড়িশা ছাড়ছেন মুসলিম শ্রমিকরা। কেউ বাইকে, কেউ বাসে, কেউ আবার ট্রেনের সাধারণ কামরায়—যেভাবেই হোক ফিরে যাচ্ছেন নিজের রাজ্যে।
ভারতীয় দৈনিক টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওড়িশায় বিজেপি শাসিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বাংলাভাষী মুসলিম শ্রমিকদের লক্ষ্য করে ‘বাংলাদেশি’ ও ‘রোহিঙ্গা’ আখ্যা দেয়ার প্রবণতা বাড়ছে। তবে গত দুই সপ্তাহে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে।
শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশে এক হিন্দু শ্রমিকের মৃত্যু এবং ৬ ডিসেম্বর মুর্শিদাবাদে নতুন বাবরি মসজিদ প্রকল্প ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনার পর থেকেই ওড়িশায় প্রতিহিংসামূলক আচরণ ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
গত ২৭ ডিসেম্বর ভোরে ওড়িশার গঞ্জাম জেলায় মইনুল শেখ, হাবিজুল শেখ, খোকন শেখ ও রাজিব শেখের ভাড়া বাসায় হিন্দুত্ববাদী উগ্র গোষ্ঠীর একদল সদস্য জোর করে ঢুকে পড়ে। তাদের ‘বাংলাদেশি’ বলে অভিযুক্ত করে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয় এবং সূর্য ওঠার আগেই রাজ্য ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়। ৫ থেকে ১২ বছর ধরে সেখানে হকারি করা এ চারজন আতঙ্কে দুটি মোটরসাইকেলে করে প্রায় ১৯ ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়ার শাহজাদপুর গ্রামে ফিরে আসেন।
রাজিব শেখ বলেন, ১২ বছর ধরে ওড়িশায় কাজ করছি, কিন্তু এমন পরিস্থিতি কখনও দেখিনি। গভীর রাতে লোকজন এসে গালিগালাজ করে বলে দেয় এখান থেকে চলে যেতে হবে। প্রাণভয়ে কিছু কাপড় ব্যাগে ভরে ভোর হওয়ার আগেই রওনা দিই। প্রচণ্ড ঠান্ডা উপেক্ষা করে টানা বাইক চালিয়ে বাড়ি ফিরেছি।
এ ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ওড়িশার বিভিন্ন বিজেপি শাসিত এলাকায় গত ১৫ দিনে বাংলাভাষী মুসলিম শ্রমিকদের ওপর হামলা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। নির্মাণকাজ ও অসংগঠিত খাতে কর্মরত শত শত শ্রমিক এখন জীবনের ভয়ে ঘরমুখো।
ঠিকাদার সাহারুল শেখ জানান, গঞ্জাম জেলায় তার অধীনে কাজ করা প্রায় ৪০ জন শ্রমিককে নিয়মিত হুমকি দেয়া হচ্ছিলো। আমাদের বাংলাদেশি, রোহিঙ্গা বলে গালি দেয়া হচ্ছিলো। মুর্শিদাবাদের শ্রমিকদের জন্য ওড়িশা এখন আর নিরাপদ নয়, বলেন তিনি।
সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে সম্বলপুরে। সেখানে সুতির বাসিন্দা ২১ বছর বয়সী নির্মাণ শ্রমিক জুয়েল শেখকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তাকেও ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে টার্গেট করা হয়েছিলো। এ ছাড়া ভুবনেশ্বরে রফিকুল শেখ নামে এক শ্রমিককে মারধর করা হলে তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় পালিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি ভগবানগোলা ব্লক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত কয়েক দিনে ওড়িশার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় এক হাজার পরিযায়ী শ্রমিক মুর্শিদাবাদে ফিরে এসেছেন। জীবিকা অনিশ্চিত হলেও অনেকেরই সিদ্ধান্ত—আর কখনও ওড়িশায় ফিরবেন না। তাদের ভাষায়, টাকার চেয়ে জীবনের দাম বেশি।
শ্রমিক সহরুল বলেন,
সন্দেহ আর ঘৃণা দ্রুত বাড়ছে। মুর্শিদাবাদের মুসলমানদের আলাদা করে টার্গেট করা হচ্ছে। রাস্তায় দেখলেই আমাদের বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা বলে দাগিয়ে দিচ্ছে। পুলিশ কোনও নিরাপত্তা দিচ্ছে না। তারা নীরব দর্শক।
হরিহরপাড়ার শাহজাদপুর গ্রামের অন্তত ২০ জন রাজমিস্ত্রি ওড়িশায় হেনস্থার শিকার হয়ে ফিরে এসেছেন। গজপতি জেলায় কাজ করা নাজিমুদ্দিন শেখ প্রথমে দুর্গাপুর হয়ে বাসে করে গ্রামে ফেরেন।
ঝাড়সুগুড়ায় কর্মরত সামসেরগঞ্জের উত্তর চাচণ্ড গ্রামের হকার নজরুল ইসলাম বলেন,
গেরুয়া পোশাক পরা কয়েকজন এসে আমার ভাড়াবাড়িতে ঢুকে ধর্ম, খাবার আর বাড়ির ঠিকানা জানতে চায়। জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ ও ‘জয় গোমাতা’ বলাতে বাধ্য করে এবং রাজ্য ছাড়ার হুমকি দেয়। প্রাণভয়ে পরদিনই ট্রেনে উঠে বাড়ি ফিরেছি।
শাড়ি বিক্রেতা মইনুল শেখ জানান, গত এক দশকে এমন পরিস্থিতি কখনও দেখেননি। গত দুই সপ্তাহে মুসলিম হকার আর রাজমিস্ত্রিদের টার্গেট করা হচ্ছে। এক রাতে আমার বাইক আটকে মারধরের চেষ্টা করে। সেদিন রাতেই পালিয়ে আসি।
এদিকে, ওড়িশায় পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর হামলা বন্ধ ও জুয়েল শেখের হত্যার বিচারের দাবিতে গত সোমবার ভগবানগোলায় প্রায় ৪০০ শ্রমিক প্রতিবাদ মিছিল করেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে বাংলাভাষী শ্রমিকদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেয়া হচ্ছে।
মুর্শিদাবাদের জেলা শাসক নীতিন সিংহানিয়া জানান, রাজ্য সরকার ফিরে আসা শ্রমিকদের পাশে রয়েছে। ‘মহাত্মাশ্রী’ প্রকল্পের আওতায় তাদের মাসে ৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়া হবে। পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ বোর্ডের চেয়ারম্যান সমীরুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের জন্য আলাদা বোর্ড থাকা বাংলার বড় শক্তি।
অন্যদিকে, প্রবীণ কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করেছেন। তিনি বলেন, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে বাংলার শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন হচ্ছে। প্রয়োজনে ওড়িশা বিধানসভা ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
তবে ওড়িশা পুলিশ দাবি করেছে, তারা এখনো এ ধরনের হামলার কোনও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পায়নি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সবার দেশ/কেএম




























