১/১১ নিয়ে বিস্ফোরক দাবি মাসুদ উদ্দিনের
খালেদা-তারেক গ্রেফতারে চাপ ছিলো দুই সম্পাদকের
এক-এগারোর ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে মুখ খুলেছেন সে সময়ের অন্যতম আলোচিত সামরিক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে গ্রেফতারের পক্ষে সেনাবাহিনী ছিলো না; বরং সুশীল সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি, বিশেষ করে দুই সম্পাদক, তাদের গ্রেফতারের জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিলেন।
একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, ২০০৭ সালের ১/১১-পরবর্তী রাজনৈতিক পটভূমি, সেনাবাহিনীর ভূমিকা, তৎকালীন সেনাপ্রধানের সঙ্গে মতবিরোধ এবং ক্ষমতা পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গত ১১ এপ্রিল আদালত তার চার দিনের নতুন রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন বলেন, কোর কমান্ড বৈঠকে খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের সদস্যদের গ্রেফতারের পরিবর্তে গৃহবন্দি রাখা অথবা বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব ছিলো। কিন্তু দুই সম্পাদকসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার পক্ষে জোর দেন। তিনি দাবি করেন, তিনি তখন তাদের সতর্ক করে বলেছিলেন—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে অত্যন্ত সম্মানিত; তার পরিবারকে গ্রেফতার করলে বাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ওই সুশীল প্রতিনিধিরা যুক্তি দিয়েছিলেন, দুই নেত্রীকে না সরালে দেশে রাজনৈতিক সংস্কার সম্ভব নয়। পরে দুই সম্পাদকের ইচ্ছায় দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে সংবাদপত্রে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
সেনাপ্রধান না হতে পারার ক্ষোভ
মাসুদ উদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে সেনাপ্রধান পদে নিজেকে সবচেয়ে যোগ্য মনে করলেও বিএনপি সরকার তাকে উপেক্ষা করে সাতজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে টপকে জেনারেল মইন উ আহমেদকে সেনাপ্রধান নিয়োগ দেয়। এ সিদ্ধান্তে তার মধ্যে ক্ষোভ জন্ম নেয় এবং সেখান থেকেই বিএনপির প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়।
এক ফোনকল বদলে দেয় পরিস্থিতি
তিনি জানান, ২০০৬ সালে দেশের রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার সময় এক ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক তাকে ফোন করে ব্যক্তিগত বৈঠকের অনুরোধ জানান। পরে গুলশানে এক শিল্পপতির বাসায় নৈশভোজে তিনি অংশ নেন, যেখানে দুই সম্পাদক, একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, লেখক ও কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে তার বৈঠক হয়। সেখানে রাজনৈতিক সংকটে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।
মাসুদ দাবি করেন, ওই বৈঠকের একদিন পর সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ তাকে সেনাসদরে ডেকে পাঠান। এরপর তাদের মধ্যে একাধিক বৈঠকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয় এবং ৮ জানুয়ারি ইয়াজউদ্দিন সরকারের অবসান ঘটানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।
১/১১-এর পরিকল্পনায় দ্বন্দ্ব
রিমান্ডে মাসুদ উদ্দিন আরও দাবি করেন, এক-এগারোর মাঝামাঝি সময়ে সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ রাজনৈতিক দল গঠন করে ক্ষমতায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। এজন্য ফেরদৌস আহমদ কোরেশীর নেতৃত্বে একটি কিংস পার্টি গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু তিনি নিজে কখনও রাজনৈতিক দল গঠনের পক্ষে ছিলেন না এবং এ নিয়ে তাদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ
তিনি আরও বলেন, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন হয়েছিলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের এক ধরনের সমঝোতার ভিত্তিতে। তার দাবি, সে সমঝোতার ফলেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে তাকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে বহাল রাখে, ব্রিগেডিয়ার বারী ও আমিনকে বিদেশে যেতে দেয় এবং জেনারেল মইনকেও সেনাপ্রধান পদে বহাল রাখা হয়।
তবে মাসুদ উদ্দিনের এসব বক্তব্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সম্পাদক, রাজনৈতিক পক্ষ বা সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তার দেয়া তথ্য যাচাই নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে, কারণ এসব দাবি এখনও তদন্তাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
সবার দেশ/কেএম




























