Sobar Desh | সবার দেশ আবু ইউসুফ


প্রকাশিত: ১৬:১৫, ৪ মে ২০২৬

আপডেট: ১৬:২১, ৪ মে ২০২৬

দুদক অচল, দুর্নীতিবাজদের উৎসব

রাষ্ট্র কি ইচ্ছাকৃতভাবেই দুর্নীতির পাহারাদার হয়ে উঠছে?

বাংলাদেশের মানুষ বহু সরকার দেখেছে। দুর্নীতিবিরোধী শ্লোগানও বহু শুনেছে। কিন্তু বাস্তবে প্রায় প্রতিটি সরকারই কোনও না কোনও পর্যায়ে দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠীর সঙ্গে আপস করেছে। কারণ দুর্নীতি শুধু অর্থের বিষয় নয়, এটি ক্ষমতার জ্বালানি।

রাষ্ট্র কি ইচ্ছাকৃতভাবেই দুর্নীতির পাহারাদার হয়ে উঠছে?
ছবি: সবার দেশ

বাংলাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় লড়াইয়ের একমাত্র সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদক। অথচ আজ সে প্রতিষ্ঠানই কার্যত মৃত। কমিশন নেই, সিদ্ধান্ত নেই, অনুমোদন নেই, কার্যক্রম নেই। আছে শুধু ফাইলের স্তূপ, অচল প্রশাসন আর দুর্নীতিবাজদের নিশ্চিন্ত নিঃশ্বাস। প্রশ্ন উঠছে—এটি কি নিছক প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক নকশা?

জাতীয় দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ এক বাস্তবতা। প্রায় দুই মাস ধরে দুদকে কোনও কমিশন নেই। ফলে নতুন কোনও অনুসন্ধান শুরু করা যাচ্ছে না। নতুন মামলা দায়ের বন্ধ। তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ বন্ধ। চার্জশিট অনুমোদন বন্ধ। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সিদ্ধান্ত বন্ধ। অর্থাৎ রাষ্ট্রের দুর্নীতিবিরোধী যন্ত্রটিকে যেনো ইচ্ছাকৃতভাবে ‘পজ’ বাটনে আটকে রাখা হয়েছে।

দুদকের করিডরে এখন নীরবতা। কিন্তু সে নীরবতার বিপরীতে দুর্নীতিবাজদের অট্টহাসি ক্রমেই উচ্চকিত হচ্ছে। যারা এতোদিন আতঙ্কে ছিলেন, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার ভয়ে গোপনে লুকিয়ে ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন আদালত ঘুরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিচ্ছেন। জব্দ হওয়া ব্যাংক হিসাব খুলে যাচ্ছে। বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার সময় পাচ্ছেন অভিযুক্তরা। আর দুদকের কর্মকর্তারা? তারা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন—কারণ সিদ্ধান্ত দেয়ার কেউ নেই।

এ এক ভয়ংকর রাষ্ট্রীয় শূন্যতা।

প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এ শূন্যতা? দুই মাসেও নতুন কমিশন গঠন হলো না কেনো? ‘সার্চ কমিটি’ কোথায়? সরকার কি জানে না যে, কমিশন ছাড়া দুদকের অস্তিত্বই অচল? নাকি সেটিই উদ্দেশ্য?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি নতুন কিছু নয়। ২০০৪ সালে বিএনপি সরকার যখন আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’কে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’-এ রূপান্তর করেছিলো, তখনও একই কৌশল দেখা গিয়েছিলো। আইন করা হলো, কিন্তু কার্যকর করা হলো না। কমিশন গঠন করা হলো, কিন্তু ক্ষমতা দেয়া হলো না। কারণ খুব দ্রুতই দুদক সরকারি প্রকল্পের ৪০০ গাড়ি উধাও হওয়ার ঘটনা অনুসন্ধানে নামে। তখনই আমলাতন্ত্রের ভেতর থেকে প্রতিরোধ শুরু হয়। বিধি না থাকার অজুহাতে কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। তিন বছর দুদককে প্রায় অচল করে রাখা হয়।

আজকের পরিস্থিতির সঙ্গে সে সময়ের অদ্ভুত মিল রয়েছে।

এখনকার প্রশ্ন আরও বড়। কারণ গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক লুটপাট সংঘটিত হয়েছে। ব্যাংক লুট হয়েছে, রিজার্ভ চুরি হয়েছে, প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। বিদ্যুৎ খাত, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, নদী খনন, জমি অধিগ্রহণ—কোথায় হয়নি দুর্নীতি?

আরও পড়ুন <<>> গুপ্ত-সুপ্ত সমাচার!

এস আলম, সামিট, বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, ওরিয়ন, শিকদার, হামিম, ইউনাইটেড—একটি অলিগার্ক শ্রেণি তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। রাষ্ট্র যেনো হয়ে উঠেছিলো করপোরেট লুটেরাদের নিরাপদ স্বর্গরাজ্য। ফ্যাসিস্ট হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে প্রশাসন, ব্যাংক, ব্যবসা ও রাজনীতি এক ভয়ংকর স্বার্থজোটে পরিণত হয়েছিলো। সে সময় বিদেশে পাচার হয়েছে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা—এটি শুধু অর্থ পাচার নয়, এটি ছিলো রাষ্ট্র পাচার।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মানুষ ভেবেছিলো—এবার হয়তো হিসাব নেয়া হবে। দুদকও নড়েচড়ে বসেছিলো। ১৪১টি মামলা। হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ। দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা। চার্জশিট। আদালতের রায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ সেল। যৌথ তদন্ত টিম। সব মিলিয়ে দুর্নীতিবিরোধী এক নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিলো।

কিন্তু হঠাৎ করেই সব থেমে গেলো।

গত ৩ মার্চ ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনসহ কমিশনের তিন সদস্য পদত্যাগ করেন। কেনো করলেন? কী চাপ ছিলো? কে চেয়েছিলো তারা সরে দাঁড়াক? জনগণ জানে না। সরকারও ব্যাখ্যা দেয়নি। অথচ একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্ব একযোগে পদত্যাগ করলে সেটি তো জাতীয় আলোচনার বিষয় হওয়ার কথা ছিলো।

কিন্তু অদ্ভুতভাবে নীরব সবাই।

এ নীরবতাই সন্দেহকে ঘনীভূত করছে।

সরকার গত ডিসেম্বরে দুদক সংস্কার নিয়ে অধ্যাদেশ জারি করেছিলো। বর্তমান সংসদ সেটি অনুমোদন করেনি। ফলে অধ্যাদেশ বাতিল হয়েছে। কিন্তু আইনজ্ঞরা স্পষ্ট বলছেন—তাতে তো ২০০৪ সালের মূল আইন কার্যকর রয়েছে। সে আইনেই কমিশন পুনর্গঠন করা সম্ভব। তাহলে বাধা কোথায়?

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী ও মনজিল মোরসেদের বক্তব্য স্পষ্ট—দুদক অচল রাখার কোনও আইনগত কারণ নেই। বরং দ্রুত কমিশন গঠন না করলে সরকার নিজেই দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়বে।

সাবেক দুদক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মো. মঈদুল ইসলামের পর্যবেক্ষণ আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তার ভাষায়, 

ভাব-চক্করে মনে হচ্ছে, দুদক নিয়ে সরকারের মাথাব্যথা নেই।

এ বক্তব্য শুধু হতাশা নয়, এটি রাষ্ট্রের জন্য সতর্ক সংকেত।

কারণ দুর্নীতি কখনও শূন্যতায় বাঁচে না। দুর্নীতি বাঁচে রাজনৈতিক আশ্রয়ে, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তায় এবং বিচারিক বিলম্বে। আজ দুদকের যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা দুর্নীতিবাজদের জন্য কার্যত সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার সমান।

একটি রাষ্ট্রে যদি দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, তাহলে জনগণ কোথায় যাবে? আদালত? আদালতে যেতে হলে তো মামলা লাগবে। মামলা করতে হলে কমিশনের অনুমোদন লাগবে। সেটিই যখন নেই, তখন বিচারপ্রক্রিয়া নিজেই অচল।

এখানে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—রাষ্ট্রের ভেতরেই যেনো দুর্নীতির জন্য ‘নিরাপদ সময়’ তৈরি করা হয়েছে। যেনো বলা হচ্ছে, 

এখনই সুযোগ, যা সরানোর সরিয়ে নাও।

এটি শুধু প্রশাসনিক সংকট নয়। এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরীক্ষা।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বারবার সুশাসন, জবাবদিহি ও সংস্কারের কথা বলেছেন। কিন্তু দুদকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান দুই মাস কমিশনহীন পড়ে থাকলে সে বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় দাঁড়ায়?

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু বক্তৃতায় হয় না। হয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে। আর আজ বাস্তবতা হলো—দুদককে শক্তিশালী নয়, বরং পঙ্গু করে রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ বহু সরকার দেখেছে। দুর্নীতিবিরোধী শ্লোগানও বহু শুনেছে। কিন্তু বাস্তবে প্রায় প্রতিটি সরকারই কোনও না কোনও পর্যায়ে দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠীর সঙ্গে আপস করেছে। কারণ দুর্নীতি শুধু অর্থের বিষয় নয়, এটি ক্ষমতার জ্বালানি।

আজ প্রশ্ন একটাই—বর্তমান সরকার কি সে পুরনো পথেই হাঁটছে?

যদি না হাঁটে, তাহলে অবিলম্বে দুদক পুনর্গঠন করতে হবে। সার্চ কমিটি সক্রিয় করতে হবে। তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম পুনরায় সচল করতে হবে। নয়তো ইতিহাস এক নির্মম সত্যই লিখবে—বাংলাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যুদ্ধটি হেরে গিয়েছিলো রাষ্ট্রের নীরবতার কাছে।

লেখক ও সংবাদকর্মী

শীর্ষ সংবাদ:

হামে ভয়াবহ পরিস্থিতি, একদিনে সর্বোচ্চ ১৭ শিশুর মৃত্যু
আওয়ামী পরিবারের সন্তান নাছিরকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা, ১০ নেতার পদত্যাগ
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে রেকর্ড উৎপাদন
মমতার জরুরি বার্তা—‘ওয়েট অ্যান্ড সি, আমরাই জিতবো’
পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনে শক্ত অবস্থানে মৌলবাদী বিজেপি
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ, হাইকোর্টে রিট
বিপৎসীমার ওপরে ৭ নদীর পানি, বন্যার শঙ্কা
টঙ্গী বস্তিতে সুড়ঙ্গপথসহ বিলাসবহুল কক্ষের সন্ধান
অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডের বৈধতা চ্যালেঞ্জ, হাইকোর্টে রিট
কেনিয়ায় বন্যা ও ভূমিধসে নিহত অন্তত ১৮
পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের ইঙ্গিত, সরকার গঠনের পথে বিজেপি
মার্কিন বাহিনীকে ‘কবরস্থানে পাঠানোর’ হুমকি ইরানের
টিসিবির পণ্য গুদামে, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
অবিরাম বৃষ্টি আর পানিতে ডুবছে হাওড়, দিশেহারা কৃষক
ভারতে চলন্ত প্লেনের দরজা খুলে লাফ দিলেন যাত্রী
জবিতে থাপ্পড়কাণ্ডে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী নেলী বহিষ্কার
নিষিদ্ধ জঙ্গি ছাত্রলীগের গোপন বৈঠক, গ্রেফতার ১৪