রাজনীতি ও সত্যের মুখোমুখি ফ্যাক্টচেক
প্রতিমন্ত্রীর ভাইরাল ভিডিও বিতর্কে সংবাদমাধ্যম ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বৈপরীত্য
সোশ্যাল মিডিয়ায় পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য ফরহাদ হোসেন আজাদের একটি বিতর্কিত ভিডিও ও ছবিকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে জামায়াতে ইসলামীর সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের নৈতিক স্খলনের ভিডিও ভাইরাল হওয়া এবং তাকে দল থেকে বহিষ্কারের ঘটনার রেশ না কাটতেই এবার সরকারের এক প্রতিমন্ত্রীর ভিডিও ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা চরম রূপ নিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে। এরপরই পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ ঘটনাটিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। তার বক্তব্য ও স্থানীয় রাজনৈতিক দলীয় সূত্রকে উদ্ধৃত করে দেশের বেশ কয়েকটি মূলধারার সংবাদমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিগুলো এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) দিয়ে তৈরি এবং 'শিবির মিডিয়া সেল' নামক পেজ থেকে এটি প্রচার করা হয়েছে। দলীয় পর্যায়ে প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা পঞ্চগড়, বোদা ও দেবীগঞ্জে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলন করে এর তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়।
তবে মূলধারার গণমাধ্যমের এ দাবির ঠিক উল্টো চিত্র উঠে এসেছে ফ্যাক্টচেকভিত্তিক পোর্টাল 'দ্য ডিসেন্ট'-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। একাধিক সংবাদমাধ্যমে আংশিক প্রকাশিত ছবি এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো কনটেন্টের সূত্র ধরে তারা উচ্চ রেজুলেশনের একটি ২০ সেকেন্ডের শব্দহীন ভিডিও, ৫টি ছবি ও হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার স্ক্রিনশট সংগ্রহ করে। একাধিক এআই কন্টেন্ট আইডেন্টিফায়ার টুল দিয়ে পরীক্ষা করার পর দ্য ডিসেন্ট জানায়, ছবি বা ভিডিওগুলো এআই দিয়ে তৈরি করার মতো কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে উঠে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। সংগৃহীত হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রিনশটের একটিতে একটি মোবাইল নম্বর ও নারীর ছবি দেখা যায়। ওই নম্বরে সচল বিকাশ অ্যাকাউন্টের সূত্র ধরে জানা যায়, সেটি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার পাঁচপীর ইউনিয়নের এক তরুণীর। কাকতালীয়ভাবে এটি প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদেরও নিজ গ্রাম। তরুণীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ছবিতে থাকা নারীটি নিজেই বলে স্বীকার করলেও এটি কীভাবে ছড়ালো তা নিয়ে অজ্ঞতা প্রকাশ করেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শৈশবে পিতৃহারা এ তরুণীর পড়াশোনার ব্যয়ভার বহন করতেন স্বয়ং প্রতিমন্ত্রী।
প্রতিবেদন তৈরির প্রক্রিয়ার মধ্যেই ঘটনার নতুন মোড় ঘোরে। অনুসন্ধানী সাংবাদিক ওই তরুণীর সঙ্গে কথা বলার মাত্র আধা ঘণ্টার মাথায় তার হোয়াটসঅ্যাপে ফোন আসে সরাসরি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের নম্বর থেকে। পরবর্তীতে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বিষয়টিকে সরাসরি পাশ কাটিয়ে সাংবাদিককে তার দফতরে চায়ের আমন্ত্রণ জানান এবং পরবর্তীতে 'ব্যস্ত আছি' বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় মারিয়া সরকার এলিন নামের এক উপস্থাপিকা স্ট্যাটাস দিয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তার দাবি, অতীতে ধ্রুবতারা সংগঠনের একটি অনুষ্ঠানে কফি শপে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে একই টেবিলে বসা একটি আনুষ্ঠানিক ছবিকে বিকৃত করে তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্মান ক্ষুণ্ণ করার চক্রান্ত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, মূলধারার বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভেতরে ভাষার অভাবনীয় মিল খুঁজে পেয়েছে ফ্যাক্টচেক পোর্টালটি। কালবেলা, যায়যায়দিন, কালের কণ্ঠ, বাংলাভিশন ও রাইজিং বিডির মতো পত্রিকাগুলোতে প্রতিবেদন প্রকাশের সময়, বাক্য গঠন, এমনকি একাধিক অনুচ্ছেদ হুবহু একই রকম দেখা গেছে। এসব প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে প্রযুক্তিগত কারসাজি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে আখ্যা দেয়া হয়েছিলো।
পঞ্চগড়ের স্থানীয় বিএনপির দাবি, ফরহাদ হোসেন আজাদের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে একটি রাজনৈতিক মহল ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এ বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে গিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ভয় ও আতঙ্কের ছাপ দেখা গেছে। হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত প্রতিমন্ত্রীর নিজ গ্রামে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে কেউ নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি। সব মিলিয়ে ডিজিটাল প্রমাণের বৈজ্ঞানিক সত্যতা এবং রাজনৈতিক আত্মপক্ষ সমর্থনের মধ্যে এ বিতর্ক এখন তুঙ্গে।
সবার দেশ/কেএম




























