২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট
‘উচ্চাভিলাষী’ মেগা বাজেট, বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ মেগা বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অবিযাত্রা’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ঘোষিত এ বাজেটটি দেশের ৫৫তম এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদের প্রথম বাজেট।
বাজেটের এ বিশাল আকারকে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এর উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, ঋণনির্ভরতা এবং সামগ্রিক বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
১. ব্যয়ের কাঠামো: এক নজরে ২০২৬-২৭ অর্থবছর
প্রস্তাবিত বাজেটের আকার দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৩.৭ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। ব্যয়ের মূল বিভাজন নিচে দেয়া হলো:
- মোট পরিচালন ব্যয়: ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা (মোট বাজেটের ৬৬.৩০%)।
- বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি): ৩ লাখ কোটি টাকা।
- মোট উন্নয়ন ব্যয়: ৩ লাখ ১৬works হাজার ৭৫ কোটি টাকা (মোট বাজেটের ৩৩.৭০%)।
ব্যয়ের গুণগত পরিবর্তন: সরকার পরিচালন ব্যয়ের অংশ চলতি অর্থবছরের ৭২.৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬.৩০ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব করেছে। বিপরীতে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ ২৭.২৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৩.৭০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।
২. রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ও এনবিআরের চ্যালেঞ্জ
আগামী অর্থবছরের জন্য মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সিংহভাগই আদায় করতে হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর)।
রাজস্ব আদায়ের খাত | লক্ষ্যমাত্রা (কোটি টাকা)
- এনবিআর নিয়ন্ত্রিত মোট কর ৬,২৯,০০০
- মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ২,২৮,৯১৫
- আয়কর ও মুনাফার ওপর কর ২,১৯,৮৩৫
- সম্পূরক শুল্ক ৮২,২৮৩
- আমদানি শুল্ক ৬১,৯৩৯
- আবগারি শুল্ক ৭,২৮৫
- রপ্তানি শুল্ক ৯৯
- করবহির্ভূত ও অন্যান্য প্রাপ্তি ৬৬,০০০
- কর ছাড়া প্রাপ্তি ২৫,০০০
চ্যালেঞ্জ: চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আগামী বছর এনবিআরকে অতিরিক্ত ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব তুলতে হবে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কর প্রশাসনের জন্য একটি বিশাল পরীক্ষা।
৩. বিশাল বাজেট ঘাটতি ও অর্থায়নের উৎস
অনুদান ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। এ বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় উৎসের ওপর বড় ধরনের ছক কষেছে:
- অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ (১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা)
- ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ: ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।
- সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে: ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
- অন্যান্য উৎস: ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
- বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ ও অনুদান: ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা।
৪. বাজেটের খরচ বণ্টন: ১০০ টাকার ছক
সরকারের পরিচালন বাজেটের খরচ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বরাদ্দের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে বিগত দিনের ঋণ ও সুদের বোঝা টানতে। প্রতি ১০০ টাকার ব্যয় খাতগুলো নিচে সাজানো হলো:
- সুদ পরিশোধ (বড় একক খাত): ২০ টাকা ৫০ পয়সা
- ভর্তুকি ও প্রণোদনা: ১৭ টাকা ০০ পয়সা
- সাহায্য মঞ্জুরি: ১৫ টাকা ৭০ পয়সা
- সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা: ১৪ টাকা ৪ পয়সা
- পণ্য ও সেবা খাত: ৯ টাকা ০০ পয়সা
- অপ্রত্যাশিত ব্যয় ও অন্যান্য: ৬ টাকা ৪০ পয়সা
- পেনশন:৫ টাকা ৭০ পয়সা
- শেয়ার ও ইক্যুইটি: ৫ টাকা ৩০ পয়সা
- সম্পদ সংগ্রহ: ৩ টাকা ৪০ পয়সা
- বিবিধ ব্যয়: ২ টাকা ৬০ পয়সা
৫. বাজেট নিয়ে বিশিষ্টজন ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের প্রতিক্রিয়া
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য (সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি):
বাজেটে যুবসমাজ ও পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য মানবিক কিছু উদ্যোগ থাকলেও এর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল। বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ ও বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের 'থোক বরাদ্দ' আর্থিক শৃঙ্খলার জন্য গভীর দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান (নির্বাহী চেয়ারম্যান, পিপিআরসি):
বাজেটে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেয়ার খণ্ডিত চেষ্টা থাকলেও কৌশলগত গভীরতার অভাব রয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বাড়লেও মানোন্নয়নের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। এছাড়া ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা ও বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।
মাহমুদ হাসান খান বাবু (সভাপতি, বিজিএমইএ):
রফতানি প্রণোদনার ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামানোকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি। তবে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সামনে আরও বেশি সহায়তামূলক নীতি প্রয়োজন বলে মনে করেন।
তাসকীন আহমেদ (সভাপতি, ডিসিসিআই):
বাজেটটিকে সামগ্রিকভাবে 'ব্যবসাবান্ধব' বললেও সরকারের ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণনির্ভরতা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের পথ সংকুচিত করবে বলে সতর্ক করেছেন। তবে শিল্পের কাঁচামালে কর হ্রাস ও প্রযুক্তিপণ্যে কর সুবিধার উদ্যোগকে তিনি সাধুবাদ জানান।
ড. আলী আফজাল (সভাপতি, রিহ্যাব):
নির্মাণসামগ্রী, বিশেষ করে রডের ওপর সুনির্দিষ্ট ভ্যাট আরোপের কারণে ফ্ল্যাটের দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাবে এবং আবাসন খাত আরও সংকুচিত হবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
মমিনুল ইসলাম (চেয়ারম্যান, ডিএসই):
পুঁজিবাজারের আধুনিকায়ন, টি+১ ও টি+০ সেটেলমেন্টের অগ্রগতি এবং এনআইটিএ (NITA) হিসাব সহজীকরণের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে একে বিনিয়োগবান্ধব বলে উল্লেখ করেছেন।
সবার দেশ/কেএম




























