ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার ফোনালাপের লিখিত রূপ
‘তোরাও পুড়াবি আয়, আমরাও পুড়াবো’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা ও বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের নির্দেশ দেয়ার অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী পলাতক হাসিনার একটি ফোনালাপের লিখিত রূপ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ উপস্থাপন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। ওই কথোপকথনে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, ‘তোরাও পুড়াবি আয়, আমরাও পুড়াবো।’
সোমবার (১০ আগস্ট) জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চতুর্থ দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন ওই ফোনালাপের লিখিত সংস্করণ ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার একাধিক টেলিফোন কথোপকথন সরকারি সংস্থার মাধ্যমে রেকর্ড করা হয়েছিলো। পরে এসব অডিওর ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয় এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এগুলো সত্য বলে প্রতিবেদন দেয় বলে ট্রাইব্যুনালে জানানো হয়।
প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে আলাপকালে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে কথা বলেন শেখ হাসিনা।
ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত ফোনালাপের লিখিত সংস্করণে শেখ হাসিনাকে বলতে উদ্ধৃত করা হয়,
ওরা আগুন দিয়ে পুড়াবে তো, তাদের বাড়ি-গাড়ি আছে, এখন সেগুলো পাবলিক দিয়ে পুড়াবে আর কী করবে।… এখন অন্য কিছু করে লাভ নাই। তোরাও পুড়াবি আয়, আমরাও পুড়াবো।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য, এ বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের যেসব বাড়িঘর, গাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিলো, সেগুলোতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের পাল্টা নির্দেশনার বিষয়টি উঠে আসে।
ফোনালাপে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের বক্তব্যও ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরে রাষ্ট্রপক্ষ। প্রসিকিউশনের দাবি, শেখ হাসিনার বক্তব্যের জবাবে হাছান মাহমুদ বিষয়টিকে ‘টিট ফর ট্যাট’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বিভিন্ন মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেয়ার কথা বলেন।
অন্যদিকে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনেও আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করেছে প্রসিকিউশন।
রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ওই ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে র্যাব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হেলিকপ্টার ব্যবহারের নির্দেশ দেয়ার প্রসঙ্গ উঠে আসে। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হামলাকারীদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শনাক্ত করে প্রতিহত করার বিষয়েও কথা বলা হয় বলে ট্রাইব্যুনালে জানানো হয়েছে।
প্রসিকিউশনের যুক্তি, এসব ফোনালাপ থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আন্দোলন দমন এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো—এমন একটি চিত্র পাওয়া যায়।
শুধু হামলা বা অগ্নিসংযোগ নয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে মোকাবিলা এবং গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিষয়েও তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হয়েছিলো বলে ট্রাইব্যুনালে দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা এ মামলায় সাবেক আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ছাড়াও তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান আসামি হিসেবে রয়েছেন।
রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, মামলার সব আসামিই বর্তমানে পলাতক।
ট্রাইব্যুনালে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় প্রসিকিউশন এসব ফোনালাপকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের বক্তব্য, ফোনালাপের ফরেনসিক যাচাই এবং এতে উঠে আসা বক্তব্যগুলো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ঘটনাবলিতে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ভূমিকা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
সবার দেশ/কেএম




























