Sobar Desh | সবার দেশ ময়মনসিংহ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০০:৪৮, ৮ জুন ২০২৫

আপডেট: ০০:৫৫, ৮ জুন ২০২৫

কোরবানির ঈদে লিপি আর আছিয়ার গল্প 

‘পোলাও-গোশতর গন্ধ পাইয়া ছেড়াডা কানছে, কেউ দেখলো না’

‘পোলাও-গোশতর গন্ধ পাইয়া ছেড়াডা কানছে, কেউ দেখলো না’
ছবি: সংগৃহীত

‘হেই বেইন্যার (সকাল) সময় বাইর অইছলাম। তহনো মাইনষে মাডও (ঈদ মাঠ) গেছে না। তহন থাইক্যাই পাড়াত পাড়াত ঘুরতাছি। কোরবানি পর গোশত কেউ দিলে দিছে আর কেউ না দিছে।

বেহেই কয় পরে আইও। পরে গেলে কয় শেষ অইয়া গেছে। দুপুরের পর পোলাও-গোশত গন্ধ পাইয়া ছেড়াডা, এরপর খালি খাইতো চাইছে। কিন্তু কেউ জিগাইছেও না। শরমে কেউর কাছে চাইছিও না। মাগরিবের সময় দোহান থাইক্যা একটা পুরি কিইন্যা দিছি। এরপর বাড়ির দিকে রওনা অইছি।’

শনিবার (৭ জুন) সন্ধ্যায় ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের নান্দাইল পৌরসভার ঝালুয়া এলাকায় এসব কথাগুলো বলছিলেন লিপি আক্তার। তিন বছরের শিশু আলিফ লামকে কোলে নিয়ে ক্লান্ত পায়ে ফিরছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিল একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ।

নান্দাইল উপজেলার সাভার গ্রামের মৃত রহমত উল্লাহর স্ত্রী লিপি আক্তার। প্রায় সাত মাস আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামী মারা যান। তারপর থেকে দুই সন্তান নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন তিনি। কোনো সহায়-সম্পদ নেই। স্বামী বেঁচে থাকতে মোটামুটি ভালোই চলছিলো পরিবার। কিন্তু স্বামী মারা যাওয়ার পর কেউ আর খবর নেয়নি। দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে শেষমেশ ভিক্ষাবৃত্তিতে নামতে বাধ্য হয়েছেন।

লিপি বলেন, এ ঈদে ছেলেমেয়েদের নতুন কাপড়ও কিনে দিতে পারিনি। তাই লোকলজ্জা পেছনে ফেলে পাড়ায় গিয়েছিলাম মাংস সংগ্রহ করতে। কিন্তু এবার যা পরিস্থিতি, সারাদিন ঘুরেও দুই কেজি মাংসও জোগাড় করতে পারিনি। ছেলেকে একটুখানি পোলাও-গোশত খাওয়াতেও পারিনি। দুপুরে ছেলের প্রচণ্ড ক্ষুধা লাগলে দোকান থেকে একটামাত্র পুরি কিনে দিয়েছি। ওইটুকুই খেয়ে শান্ত হয়েছে। এখন বাড়ি ফিরছি।

লিপির সঙ্গে ছিলেন আছিয়া বেগম (৭০)। তার হাতেও ছিল দুটি ছোট পলিথিন ব্যাগ। তিনি বলেন, বাবা, এখন তো নিজেরই লজ্জা লাগে। আগে কোরবানির দিন দু-এক ঘণ্টা পাড়া ঘুরলেই বড় বেগভর্তি মাংস পেতাম। এখন তো কয়েকজন সামান্য দিয়ে বলে—মাংস নাই। আসলে এখন সবার ফ্রিজ আছে। মাংস দ্রুত ফ্রিজে তুলে রাখে। এ দেখেন (পলিথিন দেখিয়ে) সারাদিনের কামাই। দুই কেজিও হবে না। শরীরটা আর চলতে চায় না।

পাড়ার অলিতে-গলিতে আজও এমন শত শত লিপি আর আছিয়ার গল্প রয়ে যায়। ঈদের আনন্দ যেখানে অনেকের ঘরে ফ্রিজভর্তি মাংস আর সাজানো খাবার, অন্যদিকে কারও কারও জন্য গোটা দিন না খেয়ে থাকা, আর ছেলেমেয়ের ক্ষুধার কান্না শুনে লজ্জা-অপমানে চোখের জল মুছতে থাকা।

সবার দেশ/কেএম

সর্বশেষ