বিমান হামলার পরও থামেনি তেহরান, কৌশলগত চাপে ওয়াশিংটন
ইরান যুদ্ধে পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালিয়ে শুরুতে আত্মবিশ্বাসী অবস্থান নেয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই তারা দাবি করে, ইরানের প্রায় ৭৫ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতা ধ্বংস করা হয়েছে। দ্বিতীয় সপ্তাহে সে দাবি আরও বাড়িয়ে বলা হয়, ইরানের হামলার সক্ষমতা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা হয়েছে। এমনকি ‘যুদ্ধে জয় প্রায় নিশ্চিত’—এমন বক্তব্যও উঠে আসে পশ্চিমা শিবির থেকে।
কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, বাস্তব পরিস্থিতি ততই ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কৌশলগতভাবে ইরান পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তা কার্যকরভাবে প্রয়োগও করছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি কেন্দ্রিক তৎপরতা এ যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ রুটে ইরানের হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তেল শোধনাগারে হামলা এবং ট্যাংকার চলাচলে বাধা দিয়ে ইরান কার্যত অর্থনৈতিক চাপকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
সামরিক পরিসংখ্যান বলছে, এখন পর্যন্ত ইরান প্রায় ৫ হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে খুব অল্প অংশ সরাসরি ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ছোড়া হলেও বড় অংশ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্র দেশগুলোর দিকে পরিচালিত হয়েছে। এর মাধ্যমে ইরান সংঘাতকে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক পরিসরে বিস্তৃত করেছে।
ইসরায়েল তাদের বহুস্তর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব হামলা মোকাবিলা করছে। Iron Dome, David's Sling এবং অন্যান্য ইন্টারসেপ্টর একত্রে কাজ করে অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করে জনবহুল এলাকায় আঘাত হানছে, যা হতাহতের কারণ হচ্ছে।
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ইরানের ব্যবহৃত কিছু ক্ষেপণাস্ত্র উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক বহনে সক্ষম, যা একটি পুরো ভবন ধ্বংস করতে পারে। অন্যদিকে ক্লাস্টার বোমা বহনকারী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তুলনামূলক কম শক্তিশালী হলেও বিস্তৃত এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে সক্ষম। এর ফলে প্রতিটি হামলার প্রভাব শুধু সামরিক নয়, বেসামরিক ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হচ্ছে।
পারস্য উপসাগরের আরব দেশগুলোতেও এ যুদ্ধের প্রভাব স্পষ্ট। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ একাধিক দেশ ইরানি হামলার শিকার হয়েছে। এসব দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান নিলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং নিজ ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক স্থাপনার কারণে তারা কার্যত সংঘাতের অংশ হয়ে উঠেছে।
এ দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়টসহ উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করেছে। তবে হামলার ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, ইরান সম্পূর্ণভাবে দমন হয়নি বরং নতুন কৌশলে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।
যুদ্ধ বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সরাসরি সর্বাত্মক সংঘর্ষে না গিয়ে ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধ কৌশল’ গ্রহণ করেছে। এতে তারা একদিকে সীমিত সম্পদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে প্রতিপক্ষকে উচ্চ ব্যয়ের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আটকে রাখছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার সোশ্যাল মিডিয়ায় এ যুদ্ধে সাফল্যের দাবি করেছেন। তবে বাস্তবতায় এখন পর্যন্ত ইরানের কাছ থেকে কোনও বড় কৌশলগত ছাড় আদায় করা সম্ভব হয়নি। না এসেছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ, না হয়েছে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন—যা ছিলো যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর অন্যতম।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এ পরিস্থিতিকে অতীতের ভিয়েতনাম যুদ্ধ-এর সঙ্গে তুলনা করছেন, যেখানে সামরিক সাফল্য থাকা সত্ত্বেও কৌশলগত ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত বড় পরাজয়ের রূপ নেয়।
সব মিলিয়ে বর্তমান সংঘাতে দেখা যাচ্ছে, আকাশপথে আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও স্থল ও কৌশলগত পর্যায়ে প্রত্যাশিত ফল পাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র। বিপরীতে ইরান সীমিত সক্ষমতা নিয়েও জ্বালানি সরবরাহ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সামরিক চাপ—এ তিন ক্ষেত্রেই প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।
এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সবার দেশ/কেএম




























