Sobar Desh | সবার দেশ আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০০:১৭, ৫ জানুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ০০:২৩, ৫ জানুয়ারি ২০২৬

আটকের আড়ালে সমঝোতা তত্ত্বে নতুন বিতর্ক

মাদুরোকে আটক না-কি ‘সেফ এক্সিট’—বাড়ছে সন্দেহ

মাদুরোকে আটক না-কি ‘সেফ এক্সিট’—বাড়ছে সন্দেহ
ছবি: সংগৃহীত

কয়েক মাস ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে উত্তেজনার পারদ চড়ছিলো। ক্যারিবীয় সাগরে সর্ববৃহৎ বিমানবাহী রণতরীসহ বিশাল সামরিক সমাবেশ, ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা কার্যত অচল করে দেয়া এবং জলসীমায় নৌ অবরোধ—সব মিলিয়ে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানের স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছিলো ওয়াশিংটন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে দৃশ্যপট বাস্তবায়িত হয়নি। বরং ‘ছোট পরিসরের’ এক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে দ্রুত দেশ ছাড়ে মার্কিন ডেল্টা ফোর্স।

এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার পালাবদল না হওয়া পর্যন্ত দেশটির নিয়ন্ত্রণ থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। এমনকি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেয়ার কথাও প্রকাশ্যে জানান তিনি। আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে কার্যত উপেক্ষা করে নেয়া এ অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যেই শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। দূরপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশও কূটনৈতিক ভাষায় আপত্তি জানিয়েছে।

অন্যদিকে রাশিয়া, চীন, ইরান ও কলম্বিয়ার মতো দেশগুলো সরাসরি মাদুরোকে আটক এবং ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের প্রতিবাদ জানিয়েছে। তবে এসব প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই নতুন সন্দেহের জন্ম দিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের একটি প্রতিবেদন। ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলের সূত্রের বরাতে তারা জানিয়েছে, ঘটনাটি সম্ভবত কোনও জোরপূর্বক সামরিক গ্রেফতার নয়; বরং আলোচনার মাধ্যমে একটি ‘সেফ এক্সিট’ পরিকল্পনার অংশ।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, মাদুরোর পতনে যাদের সবচেয়ে আনন্দিত হওয়ার কথা—সে ভেনেজুয়েলার বিরোধী শক্তিগুলোই এ আটকের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তাদের মতে, একটি দেশের প্রেসিডেন্টকে অন্য একটি দেশের বিশেষ বাহিনী এসে তুলে নিয়ে যাবে, অথচ স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনী বা প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ডের পক্ষ থেকে ন্যূনতম প্রতিরোধও দেখা যাবে না—এমন দৃশ্য বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলা কোনও দুর্বল বা প্রতিরক্ষাহীন রাষ্ট্র নয়। বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হুমকি ও গোয়েন্দা তৎপরতার মুখে থাকার কারণে দেশটির সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো সবসময়ই উচ্চ সতর্কতায় থাকে। এ প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের সংঘর্ষ ছাড়াই মার্কিন বাহিনীর ঢুকে প্রেসিডেন্টকে আটক করে নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যাওয়ার দাবি বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

এ সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প ও মাদুরোর মধ্যে হওয়া এক ফোনালাপের তথ্য সামনে আসার পর। তখন মাদুরো বলেছিলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার কথোপকথন ছিলো সৌহার্দ্যপূর্ণ। ট্রাম্প নিজেও ফোনালাপের কথা স্বীকার করলেও আলোচনার বিষয়বস্তু প্রকাশ করেননি।

এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মাদক পাচার দমন বিষয়ে একটি সমঝোতায় আগ্রহ দেখাচ্ছিলেন মাদুরো। গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলার একটি বন্দরে সিআইএর ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটলেও এ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি তিনি। এ নীরবতাও ‘সমঝোতার’ তত্ত্বকে শক্তিশালী করছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি যদি সত্যিই মাদুরোর জন্য একটি সেফ এক্সিট হয়ে থাকে, তবুও ওয়াশিংটন এটিকে সামরিক সাফল্য হিসেবেই উপস্থাপন করবে। কারণ এমন বার্তা ইরান, কলম্বিয়া কিংবা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধিতাকারী অন্যান্য দেশের জন্য একটি শক্ত সতর্ক সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কে নেয়া হয়েছে। সেখানে তার বিরুদ্ধে মাদক চোরাচালান সংক্রান্ত মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তবে বাস্তবে এটি গ্রেফতার, নাকি পর্দার আড়ালের কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা—সে প্রশ্নের উত্তর এখনো ধোঁয়াশায় রয়ে গেছে।

সবার দেশ/কেএম

সর্বশেষ