লক্ষ্য লোহিত সাগর-বাব আল-মান্দেবে নিরাপত্তা
সৌদির নেতৃত্বে নতুন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ
বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা জোরদারে নতুন বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব। ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ নামে এ জোটে বাংলাদেশসহ মোট ১৪টি দেশ যুক্ত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যৌথ সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এ জোট গঠন করা হয়েছে।
জোটভুক্ত দেশগুলোর ভাষ্য, ভারত মহাসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা বাব আল-মান্দেব-লোহিত সাগর-এডেন উপসাগর রুট আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কৌশলগত সমুদ্রপথে নৌচলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে নতুন জোটের প্রধান উদ্দেশ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। বিশ্বের তেল ও গ্যাস পরিবহনের একটি বড় অংশ আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করলেও বর্তমান অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। একই সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলায় বাব আল-মান্দেব, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর হয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোও বাড়তি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, জোট গঠন নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আমন্ত্রিত ৫১টি দেশের মধ্যে ৪৩টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধিদলও উপস্থিত ছিল। যদিও লোহিত সাগরে ইইউর ‘অ্যাসপিডিস’ নামে পৃথক নৌ-নিরাপত্তা মিশন ইতোমধ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে নতুন সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের কার্যক্রম কীভাবে আলাদা হবে, সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত জানানো হয়নি।
সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের সদস্য দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও কোমোরোস।
তবে একই ধরনের নিরাপত্তা স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান এখনও জোটে যোগ দেয়নি। সৌদি সরকার জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় জাতীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভবিষ্যতে যেকোনও দেশ এ জোটে যোগ দিতে পারবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, সামুদ্রিক নিরাপত্তা রক্ষা একটি যৌথ দায়িত্ব। আন্তঃদেশীয় সামুদ্রিক হুমকি মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ পরিকল্পনা প্রণয়ন, সমন্বিত মহড়া এবং প্রয়োজনে যৌথ সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনা করা হবে।
তবে কোন দেশ কতটি যুদ্ধজাহাজ, টহলজাহাজ বা সামরিক বিমান মোতায়েন করবে, সে বিষয়ে এখনও কোনও ঘোষণা দেয়া হয়নি। সৌদি আরব স্পষ্ট করেছে, এ জোট সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছে এবং এটি কোনও নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে নয়। জোটটির সদর দফতর সৌদি আরবে স্থাপন করা হবে, যদিও এর সুনির্দিষ্ট অবস্থান এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেয়, যার প্রভাব লোহিত সাগরগামী তেল পরিবহনে পড়ে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এরপর সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলের তেল ইয়ানবু বন্দরে পৌঁছে দিলেও রফতানির জন্য বাব আল-মান্দেব প্রণালি ব্যবহার করতে হয়।
ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও ইয়েমেনের মাঝখানে অবস্থিত মাত্র ২৯ কিলোমিটার প্রশস্ত বাব আল-মান্দেব প্রণালির ইয়েমেন অংশ হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সেখানে জাহাজ চলাচল এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ এবং প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল এ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এ রুটে সামান্য বিঘ্নও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের মূল্যচাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সবার দেশ/কেএম




























