গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েই দেশে ফিরলেন নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি থাকার মধ্যেই নেপালে ফিরেছেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা। চিকিৎসার জন্য প্রায় ছয় মাস বিদেশে অবস্থানের পর বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দেশে ফেরেন ৮০ বছর বয়সী এ প্রবীণ রাজনীতিক।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর বেরিয়ে আসতেই সড়কের পাশে জড়ো হওয়া শত শত সমর্থক তাকে স্বাগত জানান। দেউবা গাড়িতে ওঠার আগে সমর্থকদের দিকে হাত নেড়ে ও হাসিমুখে অভিবাদন জানান। তাকে ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং বিমানবন্দর এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিলো।
নেপাল পুলিশের মুখপাত্র অভি নারায়ণ কাফলে বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেউবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাটি দেশটির মানি লন্ডারিং তদন্ত বিভাগ পরিচালনা করছে।
অর্থ পাচারের অভিযোগে গত এপ্রিল মাসে দেউবার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে নেপাল পুলিশ। তরুণদের নেতৃত্বে ব্যাপক আন্দোলনের পর সরকারের পতন এবং বালেন্দ্র শাহ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর দেশটির প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ জোরদার করা হয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চিকিৎসার জন্য নেপাল ছাড়েন দেউবা। এরপর থেকে তিনি বিদেশেই অবস্থান করছিলেন। নিজের বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ অবশ্য শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছেন পাঁচবারের সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী।
দেশে ফেরার পর শুক্রবার (১৪ আগস্ট) থেকে শুরু হতে যাওয়া তার দলের তিন দিনব্যাপী সম্মেলনে যোগ দেয়ার কথা রয়েছে। দেউবা নেপালি কংগ্রেসের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা এবং দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
দেউবার স্ত্রী ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরজু রানা দেউবার বিরুদ্ধেও গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রাণঘাতী তরুণদের বিক্ষোভের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ব্যাপক জয় পেয়ে বালেন্দ্র শাহ ক্ষমতায় আসার প্রায় এক মাস পর তাদের বিরুদ্ধে এই আইনি পদক্ষেপ নেয়া হয়।
ক্ষমতায় আসার পর শাহ প্রশাসন পুরোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের আন্দোলন দমনে সহিংসতার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককেও গত মার্চে অল্প সময়ের জন্য গ্রেফতার করা হয়েছিলো।
নেপালে তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিলো সোশ্যাল মিডিয়ায় সাময়িক নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ থেকে। তবে দ্রুতই তা দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণে রূপ নেয়। আন্দোলনকারীরা সংসদ ভবনসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলা ও অগ্নিসংযোগ করেন। ব্যাপক সহিংসতার মুখে শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন ঘটে।
ওই আন্দোলনের সময় দেউবার বাসভবনেও হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। তার ও স্ত্রী আরজু রানা দেউবার ওপর হামলার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে দেউবার বাসভবন থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধারের দাবিও সামনে আসে।
তবে তদন্ত কমিশনের কাছে দেয়া জবানবন্দিতে দেউবা এসব ভিডিও ও অর্থ উদ্ধারের অভিযোগকে ভুয়া এবং ষড়যন্ত্রের অংশ বলে দাবি করেন। এসব ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন বলেও জানান। তার সম্পত্তি থেকে কথিত বিপুল অর্থ উদ্ধারের বিষয়টি নিয়ে আরও তদন্তের সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিশন।
এদিকে দেশে ফেরার পর এখন দেউবাকে গ্রেফতারি পরোয়ানার মুখোমুখি হতে হবে কি না, কিংবা তার বিরুদ্ধে চলমান মামলায় পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী হবে—সেদিকেই নজর রয়েছে নেপালের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষকদের।
সবার দেশ/কেএম




























