Sobar Desh | সবার দেশ জয়নুল আবেদীন


প্রকাশিত: ০১:৩৪, ২৫ মে ২০২৫

প্রবন্ধ

জাবালে উহুদ

জাবালে উহুদ
ছবি: সবার দেশ

(১ম পর্ব)

আরবিতে পাহাড়কে বলে 'জাবাল' আর মরুকে বলে ‘ফিলবার’। ফিলবার আর জাবালের দেশ আরব দেশ। দেশজুড়ে নদী জালের মতো বিছিয়ে থাকার কারণে আমাদের দেশের খেতাব যদি ‘নদীমাতৃক দেশ’ হয় তবে দেশজুড়ে পাহাড় ও মরু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার কারণে আরব দেশকেও ‘মরুমাতৃক' খেতাবে ভূষিত করা যায়। মদিনার তিন দিকেই পাহাড়, দক্ষিণে জাবালে আয়ের, পশ্চিমে জাবালে জাম্মাহ ও উত্তরে জাবালে উহুদ।

মদিনার মসজিদে নববী থেকে সোজা উত্তর দিকে তিন কিলোমিটার পরেই জাবালে ওহুদের সীমানা শুরু, শেষ উত্তরের ইউনিভার্সিটিজ রোড পর্যন্ত। উহুদের ময়দানের পূর্বে এয়ারপোর্ট রোড ও পশ্চিমে আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের রোড- এই চৌহদ্দিভুক্ত কম-বেশি ১৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়েই জাবালে ওহুদ এলাকা। উল্লেখিত ১৪ বর্গকিলোমিটারের দুই-পঞ্চমাংশ সমতল ভ‚মি বাদ দিয়ে অবশিষ্ট তিন-পঞ্চমাংশই পাহাড়, উপত্যকা, গিরিবর্ত, গিরিসংকট, গিরিগহবর ও গিরিচূড়া এলাকা। জাবালে উহুদের বড় চূড়াটির উচ্চতা এক হাজার মিটারেরও বেশি। এক সময় দ্বিতীয় রিংরোড দ্বারা পরিবেষ্টিত এলাকাকে হারাম এলাকা মনে করা হতো- বর্তমানে সর্বসম্মতিক্রমে জাবালে উহুদ এলাকাকেও হারাম এলাকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মদিনার মসজিদে নববীর নিকট থেকে এয়ারপোর্ট রোড ধরে উত্তর-পূর্ব দিকে কম-বেশি তিন কিলোমিটার পার হয়ে দ্বিতীয় রিংরোড। উভয় রোডের সংযোগ স্থলের উত্তর- পশ্চিম দিকের সমতল ময়দানের নামই উহুদের ময়দান। ময়দানের তিন দিকেই পাহাড়। এয়ারপোর্ট রোড থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে মুখ করে দাঁড়ালে ডান দিকের মূল পাহাড়টির দৈর্ঘ্য কম-বেশি সাড়ে চার কিলোমিটার। মূল পাহাড়ের মাঝামাঝি এবং উত্তর-পশ্চিম দিকে রয়েছে বেশ কয়েকটি গিরিসংকট। এর মধ্যে উত্তর-পশ্চিম দিকের গুরুত্বপূর্ণ একটি গিরিসংকটের নাম আরনায়েন নাক গিরিসংকট।

আমরা মসজিদে নববী এলাকায় ঢাকা হোটেলের নিকট থেকে ১০ আসনের গাড়ি করে এয়ারপোর্ট রোডে মিনিট দশেকের মধ্যেই তিন পাহাড়ের সামনে পৌঁছে যাই। আমাদের সামনে ময়দান। ময়দানের পূর্ব-দক্ষিণ দিক ছাড়া তিন দিকেই পাহাড়। ময়দানের এক দিকের কিছু এলাকা লোহার গ্রিলের বেড়া দিয়ে ঘেরাও দিয়ে রেখেছে। বাম দিকের উঁচু ভ‚মি, সামনের চত্বর ও গ্রিলের বেড়ার কাছে অনেক লোকজন জটলা করে কি যেন দেখছে। গাইড জানানোর আগে নিজে নিজেই জেনে গেলাম-

এটিই উহুদ প্রান্তর আর পাহাড়মালার নাম উহুদ পাহাড়। এখানেই মুসলিম জাহানের প্রথম দিনের সূর্য ধরে রাখার জন্য আত্মোৎসর্গ করেছিলেন সত্তর জন বীরসেনানী। আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল করীম (স.)-এর ইচ্ছায় আত্মোৎসর্গকারীদের যুদ্ধের ময়দানেই সমাহিত করা হয়েছিল। যুদ্ধের মাঠে সমাহিত হওয়ার পেছনেও ঘটনা রয়েছে। ঘটনা রয়েছে যুদ্ধে পরাজয়ের কারণ ও হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর একটি দত্ত শহীদ হওয়াসহ মুখমÐল ক্ষত-বিক্ষত হওয়ারও। ছাত্রজীবনে ফেলে আসা স্মৃতির বায়ান্ন বাজার তেপান্ন গলির চিলেকোঠা গলিয়ে সুস্পষ্ট ভেসে উঠেছে চৌদ্দশ বছর আগের উহুদের যুদ্ধের কারণ ও চিত্র। ডিগ্রি ক্লাসে ইসলামের ইতিহাসের শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল ‘উহুদের যুদ্ধে পরাজয়ের কারণ ও ফলাফল'।
বদরের যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে কোরেশরা ভেঙে পড়লো। মদিনার স্বার্থপর ইহুদিরা কাব্য, কবিতা, কুমন্ত্রণাসহ নানাভাবে উৎসাহ দিয়ে ভেঙে পড়া কোরেশদের চাঙ্গা করে তুললো। শুধু কোরেশ নয় বেদুঈনদেরও মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে শুরু করে। বদরের যুদ্ধের পর মদিনার ক্রমোন্নতিসহ ইসলামের প্রসার মক্কাবাসীগণ কিছুতেই সহ্য করতে পারলো না। তারা মুসলমানদের মূল উৎপাটনের জন্য পুনরায় প্রস্তুত হতে শুরু করলো।

এ যুদ্ধে প্রস্তুত হওয়ার পেছনে মূল ইন্ধনদাতা ছিল আবু সুফিয়ান ও তার স্ত্রী হিন্দা। কোরেশ সর্দার আবু সুফিয়ানের প্রতিজ্ঞার পেছনে কারণ হলো-
- আমার শ্বশুর ওতবা, চাচা শ্বশুর শায়বা এবং শ্যালক ওয়ালিদ বদরের যুদ্ধে নিহত হয়েছে। এ ছাড়া আবু জেহেলসহ আমার বংশের পুরুষ প্রধানগণ এবং আমার হাঞ্জালা বদর যুদ্ধে নিহত হয়েছে, সুতরাং প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমি এই যুদ্ধে অগ্রণী হব।
একথা বলে যুদ্ধ পরিচালনার সমস্ত ব্যয় আবু সুফিয়ান বহন করতে সম্মত হয়। মক্কায় শুরু হয় যুদ্ধের সাজ সাজ রব। কোরেশরা উত্তেজিত হয়ে এই মর্মে প্রতিজ্ঞা করে বসে যে-
যতদিন তারা প্রতিশোধ গ্রহণসহ মুসলমানদের সমুচিত শাস্তি দিতে না পারবে ততদিন পর্যন্ত তারা সর্ব প্রকার আরাম-আয়েশ, ভোগ-বিলাস থেকে বিরত থাকবে, এমনকি তেল বা নারী স্পর্শ করবে না। ৭০০ বর্মধারী, ৩০০ উষ্ট্রারোহী ও ২০০ অশ্বারোহীসহ মোট ৩০০০ সৈন্য আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মদিনা অভিযানে রওয়ানা হয়ে ১০ দিনে উহুদের পাহাড়ের নিকট পৌঁছে।

মক্কার অশুভ সাজ সাজ রবের খবর মদিনা পৌঁছতে বিলম্ব হয়নি। যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠার পর রাজপথে সমবেত মুসলমানদের উদ্দেশ্য করে নবী করিম (স.) বললেন-
- ‘তোমরা যুদ্ধকালে যথাসাধ্য দৃঢ়তা ও সহিষ্ণুতা অবলম্বন করবে। তোমাদের নেতার আদেশ প্রাণপণে পালন করবে। নেতার আদেশ যুক্তিযুক্ত কিনা বিচার করবে না। নেতার আদেশের তাৎপর্য অনুমান করে নিজের বুদ্ধি দ্বারা পরিচালিত হয়ে কোনো কার্য করবে না, তাহলে তোমরা নিশ্চয়ই জয়লাভ করবে।'

হযরত (স.)-এর পতাকাতলে কম-বেশি এক হাজার যোদ্ধা সমবেত হয়। জনৈক অমুসলিম (কারো কারো মতে মুনাফিক) আবদুল্লাহ বিন ওবাই তিন'শ সৈন্যসহ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলো। রাসূল (স.) ওবাইকে অমুসলিম অবস্থায় যুদ্ধে নিতে অস্বীকার করে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানান। ওবাই ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করে তিন'শ যোদ্ধাসহ প্রত্যাবর্তন করার পর মোট যোদ্ধা থাকে ৭০০ (সাত শ)।

আরও পড়ুন <<>> মসজিদে গামামা

মাকদুমের পুত্র আবদুল্লাহকে মদিনার খলিফার পদে নিয়োগ করে মুহাম্মদ (স.) মদিনা থেকে উহুদ অভিমুখে রওয়ানা হলেন। তিনি ৬২৫ খ্রিস্টাব্দের ২১ মার্চ উহুদের প্রান্তরে উপস্থিত হয়ে উহুদের পাহাড় বাম হাতে রেখে মদিনার দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। তিনি রক্ষাব্যূহ নির্মাণসহ সমর কৌশল হিসেবে পাহাড়ের সংকীর্ণ ও বিপজ্জনক গিরিসংকট আর নায়েননাক রক্ষার দায়িত্ব দিলেন জোবায়ের পুত্র আবদুল্লাহকে। আবদুল্লাহকে ৫০ জন সুদক্ষ ধনুকধারী সৈন্যসহ তথায় স্থাপন করে বললেন-
- যুদ্ধে জয়-পরাজয় যাই হোক, তোমরা আমার বিনা আদেশে কখনো এ স্থান ত্যাগ করবে না। এ কথা তোমরা সর্বদা স্মরণ রাখবে।

আবু সালামকে সৈন্যদের বাম দিক রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে বললেন-
যতক্ষণ পর্যন্ত আমার নিকট থেকে অন্য আদেশ না পাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ স্থান রক্ষার দায়িত্বে তুমি থাকবে।
এভাবে অপরাপর যোদ্ধাদের যথাযথ নির্দেশ দানসহ শক্ত ব্যূহ রচনা করে হযরত (স.) স্বয়ং যুদ্ধের মধ্যভাগ পরিচালনার ভার গ্রহণ করলেন।

ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। মল্ল যুদ্ধ দিয়ে এ যুদ্ধের সূচনা হয়। মল্লযুদ্ধে মহাবীর হামজার কাছে কোরেশ পক্ষের মহাবীর তালহা নিহত হয়। তালহার পর তার ভ‚লুণ্ঠিত পতাকা হাতে নিয়ে যুদ্ধে অংশ নেয় তৎভ্রাতা ওসমান। বীর হামজার তরবারির আঘাতে ওসমানের ডান হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাকে সাহায্য করতে আসে তৎভ্রাতা আবু সাঈদ মুসলিম তীরন্দাজ সাদের তীরের আঘাতে সেও পরলোক গমন করে। 

মুসলিম বীর পতাকাধারীগণ যখন একে একে কোরেশ পতাকাধারীদের ধরাশায়ী করতে শুরু করলো তখন কোরেশ সৈন্যরা পরাজয় শুরু হয়েছে বলে মনে করে হতবুদ্ধি হয়ে নিজ নিজ প্রাণ নিয়ে রণক্ষেত্র ছেড়ে পলায়ন করতে আরম্ভ করলো। নারীনেত্রী হিন্দা মহিলা দল নিয়ে উত্তেজনাকর গণসঙ্গীত গেয়ে গেয়ে কোরেশ যোদ্ধাদের উত্তেজিত করছিল। মুসলমান সৈন্যগণ কোরেশ যোদ্ধাদের পতাকা কেড়ে নিয়ে কোরেশদের রমণী শিবিরে উপস্থিত হতে শুরু করলে রমণীদের উত্তেজনাকর গণসঙ্গীত বিলাপ ও আর্তনাদে পরিণত হলো। এই সময় কিছু মুসলমান যোদ্ধা দুর্লোভের বশবর্তী হয়ে শত্রু শিবির লুটপাটসহ শত্রু শিবিরের মহিলাদের দখল করতে শুরু করে। এসব করতে গিয়ে আবদুল্লাহ তার ৫০ সৈন্যসহ আর নায়েননান গিরিসংকট রক্ষায় যেই না অবহেলাসহ শৈথিল্য প্রদর্শন করছে অমনি কোরেশ সেনাপতি খালেদ বন্যার বেগে গিরি সঙ্কটে ঢুকে পড়ে। বীর যোদ্ধা সুযোগ সন্ধানী খালিদ বহুক্ষণ পূর্ব থেকেই একদল দক্ষ ও সাহসী যোদ্ধা নিয়ে এ রকম একটি সুযোগের সন্ধানে ছিল। খালিদকে সহযোগিতা করলো কোরেশদের অন্যতম বীর যোদ্ধা আকরামা। কল্পনাতীত ও অতর্কিত এ আক্রমণে মুসলমান সৈন্য হতবিহŸল, কিংকর্তব্যবিমূঢ়সহ কাÐজ্ঞানহীন হয়ে পড়ে। দেখতে না দেখতে যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের চিত্র পাল্টে যেতে শুরু করে। এর মধ্যে প্রচার হয় যুদ্ধে হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর মৃত্যু হয়েছে। এ সংবাদ প্রচার হওয়া মাত্র মুসলমান শিবিরে মহা গোলযোগ আরম্ভ হয়ে যায়। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে মুসলিম যোদ্ধাগণ প্রাণ নিয়ে পালাতে আরম্ভ করে। এ সঙ্কট মুহূর্তে আবু বকর (রা.), হযরত আলী (ক.), তালহাসহ বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট বীর ও রাসূলভক্ত রাসূল (স.)-এর পাশে এসে এই মর্মে প্রতিজ্ঞা করেন যে, তাদের মধ্যে একজনও জীবিত থাকতে শত্রু যোদ্ধারা হযরতের কেশাগ্র পর্যন্ত স্পর্শ করতে দিবে না। (চলবে,,,)

লেখক: আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক

শীর্ষ সংবাদ:

পাঁচ অস্ত্রসহ গ্রেফতার লিটন গাজী সম্পর্কে সব জানালো পুলিশ সুপার
আনসার ভিডিপি ব্যাংকের ৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ, ব্যবস্থাপক গ্রেফতার
লালমনিরহাটে স্বামী হত্যা মামলায় স্ত্রী ও পরকীয়া প্রেমিকের যাবজ্জীবন
ভোলাহাটে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে কলেজ শিক্ষকের মৃত্যু
সৌদি আরবে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দালাল চক্রের খপ্পরে
বাংলাদেশ সীমান্তে পঁচছে ৩০ হাজার টন ভারতীয় পেঁয়াজ
সুদের টাকার জন্য নোয়াখালীতে ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা, গ্রেফতার-১
ইমরান খান বেঁচে আছেন, দেশ ছাড়তে চাপ: পিটিআই
হাসিনা-রেহানা-টিউলিপের প্লট দুর্নীতি মামলার রায় আজ
শুরু হলো বিজয়ের মাস
বিডিআর হত্যাকাণ্ডে ভারত জড়িত
খালেদা জিয়ার খোঁজ নিতে হাসপাতালে জামায়াত সেক্রেটারি
স্কুল ভর্তির লটারি ১১ ডিসেম্বর
বিডিআরকে দুর্বল করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখাতেই পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ছয় উপসচিবের দফতর পরিবর্তন