উঠে এলো আরটির বিশ্লেষণে
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হারের নেপথ্যে ৪ কারণ
ইরানের সঙ্গে সংঘাতে সামরিকভাবে শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি করেছে রুশ সংবাদমাধ্যম আরটি। তাদের প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির বাস্তবতাই নয়, বরং আধুনিক বিশ্বে সামরিক শক্তির কার্যকারিতা সম্পর্কেও নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
বুধবার (১৭ জুন) প্রকাশিত ওই বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে রাশিয়া ইন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর প্রধান সম্পাদক ফাইদর লুকিয়ানভ বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় সামরিক শক্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। কারণ শক্তি প্রয়োগের ফলাফল এখন আর সরলরৈখিক নয় এবং তুলনামূলক দুর্বল পক্ষও অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের নিয়ে গঠিত শক্তিশালী জোট ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেও নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। অথচ ইরানকে তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিলো। দেশটির পাশে ছিলো কয়েকটি মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং রাশিয়া ও চীনের সীমিত সমর্থন।
আরটির মতে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ধারণা ছিলো যে, বহিরাগত চাপ ও অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দ্রুত নতি স্বীকার করবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি সে মনোভাবেরই প্রতিফলন ছিলো।
কিন্তু বাস্তবে ইরান প্রত্যাশিতভাবে ভেঙে না পড়ে দ্রুত নিজেদের পুনর্গঠিত করে এবং পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এর ফলে সামরিকভাবে শক্তিশালী পক্ষ অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

প্রতিবেদনে ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতার চারটি প্রধান কারণ তুলে ধরা হয়েছে।
- প্রথমত, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার পদক্ষেপ নেয় ইরান। দীর্ঘদিন ধরে এমন হুমকি দিলেও বাস্তবে এবার তারা সে পথে এগোয়, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে।
- দ্বিতীয়ত, ইরান শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থকেই লক্ষ্যবস্তু করেনি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাতেও চাপ সৃষ্টি করেছে।
- তৃতীয়ত, সামরিক সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকলেও ইরানের অস্ত্রভান্ডার এমন পর্যায়ের ছিলো, যা প্রতিপক্ষের জন্য উল্লেখযোগ্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। ফলে সামরিক ভারসাম্য পুরোপুরি একতরফা হয়ে ওঠেনি।
- চতুর্থত, ইরান দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করার যে সক্ষমতা দেখিয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে জটিল করে তোলে।
বিশ্লেষণে দাবি করা হয়, যুদ্ধের ঘোষিত উদ্দেশ্যগুলোর কোনোটিই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল অর্জন করতে পারেনি। বরং সংঘাতের পর অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরে গেছে। আর পারস্য কূটনীতির ঐতিহ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি ধৈর্য ও সময়ক্ষেপণ কৌশল ইরানের অন্যতম শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সংঘাত-পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে স্থিতাবস্থা ফিরে আসছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও এর শর্ত ও বাস্তবতা নিয়ে এখনও বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
ফাইদর লুকিয়ানভের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর বিভিন্ন সংঘাত প্রমাণ করেছে যে, দুর্বল রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীগুলোর প্রতিরোধ ক্ষমতা আগের তুলনায় বেড়েছে। অন্যদিকে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে ক্রমেই অনাগ্রহী হয়ে উঠছে।
আরটির বিশ্লেষণে উপসংহারে বলা হয়, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি বৈশ্বিক পরাশক্তির সীমাবদ্ধতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। যুদ্ধের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন নতুন কোনও পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে জড়াতে অনেক বেশি সতর্ক ও অনিচ্ছুক বলে মনে হচ্ছে।
তবে এটি আরটির একটি বিশ্লেষণধর্মী মূল্যায়ন, এবং সংঘাতের ফলাফল ও বিজয়-পরাজয় নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভিন্নমত ও ভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























