বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞ শুরু আজ, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকছে চমক
অবশেষে অপেক্ষার প্রহর শেষ। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও জাঁকজমকপূর্ণ আসর ফিফা বিশ্বকাপের পর্দা উঠছে আজ। ফুটবলপ্রেমীদের চার বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে শুরু হচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ, যেখানে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা—যৌথভাবে আয়োজন করছে এ বৈশ্বিক মহোৎসব।
৩৯ দিনব্যাপী এ টুর্নামেন্টে তিন দেশের ১৬টি ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হবে মোট ১০৪টি ম্যাচ। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকোর ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা। আর আগামী ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে মহারণের ফাইনাল।
তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগে বিশ্বের নজর থাকবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিকে। কারণ এবার শুধু ফুটবল নয়, সংস্কৃতি, সংগীত, প্রযুক্তি ও ঐক্যের বার্তা নিয়ে এক অনন্য আয়োজন সাজিয়েছে ফিফা ও আয়োজক দেশগুলো।
তিন দেশে একসঙ্গে উদ্বোধনের বিরল আয়োজন
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম তিনটি আয়োজক দেশে সমান্তরালভাবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মেক্সিকো সিটি, টরন্টো এবং লস অ্যাঞ্জেলেসে আয়োজিত হবে পৃথক তিনটি অনুষ্ঠান। প্রতিটি আয়োজন শুরু হবে সংশ্লিষ্ট ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত ম্যাচের প্রায় ৯০ মিনিট আগে।

যদিও অনুষ্ঠানগুলো আলাদা, তবে সবগুলোর মূল প্রতিপাদ্য এক—ফুটবল মানুষের মধ্যে ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বিভেদ দূর করে বিশ্বকে একত্রিত করে।
বিশ্বখ্যাত ইভেন্ট নির্মাতা মার্কো বালির তত্ত্বাবধানে আয়োজন করা হয়েছে এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানগুলো। অলিম্পিকসহ বিশ্বের একাধিক বড় ক্রীড়া আসরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত এ প্রযোজক জানিয়েছেন, প্রতিটি আয়োজক দেশ নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরবে, তবে সব আয়োজনই একটি অভিন্ন বৈশ্বিক বার্তার সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেছেন, বিশ্বকাপের উদ্বোধন এমন একটি মুহূর্ত, যা পুরো বিশ্ব একসঙ্গে অনুভব করে। মেক্সিকো সিটি, টরন্টো ও লস অ্যাঞ্জেলেসের অনুষ্ঠানগুলো সংগীত, সংস্কৃতি এবং ফুটবলের এক অভিন্ন উৎসবে পরিণত হবে।
মেক্সিকোর অনুষ্ঠানে ঐতিহ্য আর আবেগের মেলবন্ধন
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় আয়োজন হবে মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে থাকা এ স্টেডিয়াম আবারও বিশ্ববাসীর নজরের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।
মেক্সিকোর অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ থাকবে দেশটির ঐতিহ্যবাহী ‘পাপেল পিকাডো’ শিল্পকর্ম, লোকজ সংস্কৃতি এবং আধুনিক শিল্পের সমন্বয়ে তৈরি বিশাল ভিজ্যুয়াল প্রদর্শনী।
মঞ্চ মাতাতে উপস্থিত থাকবেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী শাকিরা, জে বালভিন, মানা, লিলা ডাউনসসহ আরও অনেক জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী। রঙ, আলো, নৃত্য এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিশেষ প্রদর্শনীর মাধ্যমে তুলে ধরা হবে মেক্সিকোর ঐতিহ্য ও ফুটবলপ্রেম।

জানা গেছে, মেক্সিকোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান চলবে প্রায় ১৬ মিনিট ৩০ সেকেন্ড।
টরন্টোতে কানাডার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রদর্শনী
বিশ্বকাপ আয়োজনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাগতিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে কানাডা। তাই টরন্টোতে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
‘কালচারাল মোজাইক’ বা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে কানাডার আয়োজন। বিভিন্ন জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির সহাবস্থানকে তুলে ধরা হবে আধুনিক প্রযুক্তি, সংগীত ও নৃত্যের মাধ্যমে।
অনুষ্ঠানে পারফর্ম করবেন আলানিস মরিসেট, মাইকেল বুবলে, এলেসিয়া কারা, জেসি রেইজ, নোরা ফাতেহি, সঞ্জয়সহ একাধিক জনপ্রিয় শিল্পী।
কানাডার ফুটবল ইতিহাসে এটি একটি বিশেষ মুহূর্ত। নিজেদের মাটিতে প্রথমবার বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজনের আগে দেশটির দর্শকদের জন্য এটি হবে এক স্মরণীয় উৎসব।
লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রযুক্তি আর বিনোদনের ঝলক
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে লস অ্যাঞ্জেলেসে। বিশ্বের বিনোদন রাজধানী হিসেবে পরিচিত এ শহরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে থাকবে বিশাল ভিজ্যুয়াল শো, অত্যাধুনিক আলোকসজ্জা এবং প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশনা।
দর্শকদের মাতাতে মঞ্চে উঠবেন কেটি পেরি, ফিউচার, আনিতা, এলএল কুল জে এবং রেমার মতো আন্তর্জাতিক তারকারা।

আয়োজকরা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অনুষ্ঠানে ফুটবলের সঙ্গে বিনোদন জগতের সংযোগকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হবে। স্টেডিয়ামজুড়ে থাকবে অত্যাধুনিক লাইটিং, ড্রোন শো এবং বিশেষ প্রজেকশন ম্যাপিংয়ের প্রদর্শনী।
বিশ্বজুড়ে কোটি দর্শকের নজর
তিন দেশের তিন ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হবে বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলে। ধারণা করা হচ্ছে, শত শত কোটি দর্শক টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এ অনুষ্ঠান উপভোগ করবেন।
উদ্বোধনী আয়োজন শেষে মাঠে নামবেন খেলোয়াড়রা। এরপর ওয়ার্ম-আপ, আনুষ্ঠানিক পরিচিতি পর্ব এবং ফিফার নির্ধারিত প্রোটোকল শেষে শুরু হবে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ।
সবকিছু মিলিয়ে ফুটবল, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক ঐক্যের বার্তা নিয়ে আজ শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপের নতুন অধ্যায়। আগামী এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে একই আবেগে বেঁধে রাখবে ফুটবলের এ মহাযজ্ঞ।
সবার দেশ/কেএম




























