Sobar Desh | সবার দেশ অমৃতা ইশরাত


প্রকাশিত: ০০:১২, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ১৩:৪৭, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মানুষকেন্দ্রিকতার পুনর্বিবেচনা: প্রাণীদের ইন্টেগ্রিটি ও ইনটুইশন

মানুষকেন্দ্রিকতার পুনর্বিবেচনা: প্রাণীদের ইন্টেগ্রিটি ও ইনটুইশন
ছবি: সবার দেশ

মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে কেন্দ্র ধরে চিন্তা করে। ইতিহাস, ধর্ম, বিজ্ঞান—সব ক্ষেত্রেই আমরা নিজেদেরকে বিশেষ, কখনও শ্রেষ্ঠ, কখনও ব্যতিক্রমী হিসেবে ব্যাখ্যা করেছি। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এ ধারণাকে আরও শক্ত করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো বিবর্তন কোনও সিঁড়ি নয় যেখানে মানুষ শীর্ষে উঠে বসেছে। এটা চলমান ও বিস্তৃত প্রক্রিয়া যেখানে প্রতিটি প্রজাতি পরিবেশ অনুযায়ী নিজস্ব দক্ষতা ও কৌশল গড়ে তুলেছে।

চার্লস ডারউইন আমাদের দেখিয়েছেন টিকে থাকা নির্ভর করে অভিযোজনের ওপর। এখানে শক্তি নয়, সামঞ্জস্যই মূল কথা। পেঁচা, বেড়াল, কুকুর বা পিপড়ে—কেউ অপূর্ণ নয়। নির্দিষ্ট পরিবেশে কার্যকরভাবে টিকে থাকায় এরাও সফল।

আমরা যখন প্রাণীদের ইন্টেগ্রিটি নিয়ে কথা বলি, তখন বিষয়টি নৈতিকতার প্রশ্ন নয়। ইন্টেগ্রিটি মানে সত্তার অখণ্ডতা—নিজস্ব জৈব কাঠামোর সাথে মিল রেখে রেখে কাজ করা। পেঁচা অন্ধকারে নিঃশব্দে শিকার করে কারণ তার দেখা ও শোনার শক্তি সে কাজের জন্য উপযোগী। বেড়াল শিকারের আগে স্থির হয়ে যায়—এটা তার আচরণগত কৌশল, আবেগপ্রবণ ভঙ্গি নয়। পিপড়েরা রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে সারিবদ্ধভাবে চলাচল করে, এ সরল নিয়ম তাদের সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত।

এ জায়গায় প্রাণীদের আচরণে এক ধরনের স্বচ্ছতা আছে। তারা সামাজিক প্রত্যাশার সাথে নিজের প্রকৃতিকে আলাদা করে না। মানুষ অনেক সময় করে। আমরা পরিস্থিতি অনুযায়ী মুখোশ বদলাই, আচরণ সামঞ্জস্য করি, কখনো নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করি। তাই আমাদের 'Social Integrity আর 'Internal Integrity' এক হয় না।

স্নায়ুবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে, মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী কাঠামো 'লিম্বিক সিস্টেম' অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতোই। ভয়, স্নেহ, প্রতিরক্ষা, বন্ধন—এসব অনুভূতি আমাদের একার নয়। কুকুর মানুষের কণ্ঠস্বর ও মুখভঙ্গির সূক্ষ্ম পরিবর্তন ধরতে পারে। পরিবেশ ও মানুষের আচরণ থেকে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। পাখিরা ইকোলোকেশন তৈরি করে আগাম বিপদ বুঝতে পারে। ইনটুইশন মানে এখানে অতিপ্রাকৃত কিছু নয়—দ্রুত ও অবচেতন তথ্য বিশ্লেষণ।

মানবসভ্যতা নিজের জন্য শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। ইউভাল নোয়া হারারি তার সেপিয়েন্স বইয়ে ব্যাখ্যা করেছেন, মানুষের বড় শক্তি হলো কল্পিত কাঠামো তৈরি করে সমষ্টিগতভাবে বিশ্বাস করা। রাষ্ট্র, আইন, অর্থনীতি—এসব বাস্তব বস্তু নয় কিন্তু বিশ্বাসের মাধ্যমে কার্যকর হয়। এ ক্ষমতা সভ্যতা গড়লেও মানুষকে প্রকৃতি থেকে আলাদা এক ব্যবস্থায় বন্দি করেছে।

পরবর্তীতে তার বই নেক্সাস দেখায়, বর্তমান যুগ তথ্য ও নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চলছে। কিন্তু এ নেটওয়ার্ক শুধু মানুষের নয়—প্রকৃতিরও আছে। বাস্তুতন্ত্র এক জটিল সিস্টেম যেখানে খাদ্যশৃঙ্খল, পরাগায়ন, মাটির অণুজীব ও জীববৈচিত্র্য পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। একটা প্রজাতি হারালে সে ভারসাম্য নড়ে যায়। বন উজাড় বা নদী দূষণ কেবল পরিবেশগত ক্ষতি নয় সেই সিস্টেম ভাঙার প্রক্রিয়া।

আরও পড়ুন <<>> মাতৃভাষা: মনস্তত্ত্ব, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়

আজ আমরা জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্য দ্রুত ক্ষয়ের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি। প্রযুক্তি আমাদের ক্ষমতা দিয়েছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের নৈতিকতা সবসময় তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। 'উন্নয়ন' এখানে নয়, সমস্যা হলো উন্নয়নকে শুধু উৎপাদন ও ভোগের বৃদ্ধি হিসেবে দেখা। যদি উন্নয়ন বাস্তুতন্ত্রকে দুর্বল করে, তবে সেটা দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী।

অন্যান্য প্রাণীদের জীবন গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায় টিকে থাকার জন্য আধিপত্য নয়—সামঞ্জস্য প্রয়োজন। তাদের ইন্টেগ্রিটি বস্তুত ভৌত কাঠামোর প্রতি বিশ্বস্ত থাকা। তাদের ইনটুইশন হলো পরিবেশকে দ্রুত ও সঠিকভাবে বোঝার ক্ষমতা। এসব মানবজাতির জন্য প্রতিযোগিতার বিষয় নয়, পর্যবেক্ষণ ও শেখার ক্ষেত্র। ভাষা, বিমূর্ত চিন্তা ও প্রযুক্তি আমাদের আলাদা করেছে কিন্তু এ আলাদা হওয়া মানে শ্রেষ্ঠত্ব নয়। বিশেষ ক্ষমতার সঙ্গে দায়ও বাড়ে। যদি সে দায় উপেক্ষা করা হয়, তবে শক্তিই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।মানুষকেন্দ্রিকতার পুনর্বিবেচনা মানে এক প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া—আমরা কি প্রকৃতির ওপর দাঁড়িয়ে আছি, নাকি প্রকৃতির ভেতরে কাজ করছি? এ প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হলে আমাদের আচরণও বদলাবে।

লেখক:
ব্যাংকার

সম্পর্কিত বিষয়:

শীর্ষ সংবাদ:

খামেনি হত্যার প্রতিশোধের লাল পতাকা উড়ালো ইরান
ইসরায়েলি হামলায় কেঁপে উঠলো ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভবন
চরাঞ্চলের অর্থনীতিতে ভরসা প্রাণিসম্পদ খাত, সেবার সংকটে শঙ্কা
রাষ্ট্রপতির অভিশংসনেই সংসদের যাত্রা শুরু হোক: আসিফ
ইরানে হামলার তীব্র নিন্দা জামায়াত আমিরের
রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করে গ্রেফতারের দাবি নাহিদ ইসলামের
যুক্তরাষ্ট্রে রাতভর গোলাগুলি, নিহত ৩, আহত ১৪
ভারত থেকে দেশে ফিরলো আওয়ামী এমপির লাশ
যশোরে জেলা জজ পদশূন্য, ভারপ্রাপ্ত জজের ওপর অনাস্থা
খামেনিকে হত্যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী
কোকো ভাইয়ের অবদান তুলে ধরতে পারিনি—অনুশোচনায় তামিম
হরমুজ প্রণালি বন্ধে বিশ্ব তেলবাজার টালমাটাল-দাম লাফিয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি
জনগণের প্রত্যাশা পূরণে দায়িত্বশীল প্রশাসনের ওপর গুরুত্বারোপ
বীরগঞ্জে ২ মাদক সেবীর কারাদণ্ড
খাগড়াছড়িতে আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদ নির্বাচনসহ ৭ দফা দাবিতে স্মারকলিপি
আধিপত্যবাদের নগ্নরূপ: আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট
ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদিনেজাদ নিহত: রিপোর্ট
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র চুরমার করলো ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা, নিহত ৮