আইনের সঠিক প্রয়োগ বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে সহায়ক
আগারগাঁও নাক, কান, গলা হাসপাতালের সামনের রাস্তা দাঁড়িয়ে আছি, বন্ধু সিরাজ ইনস্টিটিউট অফ ল্যাবরেটরি মেডিসিন থেকে বন্ধু ডাক্তার সাইফুলের সাথে সাক্ষাৎ শেষে আমাকে তার গাড়িতে পিক আপ করবে সেজন্য। হঠাৎ নজর গেলো এক ভাই গলার দুই দিক থেকে গামছা দিয়ে বাঁধা বুক ও নাভির মাঝ বরাবর সামনের দিকে একটি ডালা ঝুলিয়ে সিগারেট এবং পান এতটুকু সওদা নিয়ে ফেরি করে বিক্রি করছে আশেপাশের এলাকায়।
সে যখন রাস্তা পার হবে তখন তার একেবারে কাছে গিয়ে কৌতূহলী হয়ে নাম জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম এ সওদাগর ভাইয়ের নাম ইমান আলী।
বাড়ি কোথায় ?
ধোবাউড়া।
ওহ নেত্রকোনা ডিস্ট্রিক্ট! তো ভাই সারাদিন কয় টাকার ব্যবসা করেন?
মাথা নিচু করে স্বল্প আওয়াজে জবাব দিলেন, এই তো সারাদিনে ৬০০ টাকার মত থাহে।
ছেলে মেয়ে কয়জন?
তিন মেয়ে।
চলে এই আয়ে আপনার?
আল্লাহ চালায়।
৬০০ টাকা করে ৩০ দিনে ১৮ হাজার টাকা মাস প্রতি। এটি তো সরল হিসাব, কিন্তু রোগ বালাই দাওয়াত ইত্যাদি মিলিয়ে গড়পড়তা মাসে আয় ধরুন ১৫ হাজার টাকা। কিছুক্ষণ আলাপোচনায় জানতে পারলাম তার এতেই চলে যায় এবং সে এতেই সন্তুষ্ট। এক কথায় আলহামদুলিল্লাহ, সাধারণ মানুষের সাধারণ সন্তুষ্টির নমুনা।
অথচ এ ১৫ হাজার টাকা বর্তমান সমাজে অনেক ধন কুবেরের একদিনের পানীয়ের খরচের চেয়েও কম। এরকম হাজারো সাধারণ মানুষ নিত্য তাদের জীবন কর্ম চালিয়ে যাচ্ছে আমাদের এ সমাজে আমাদের সাথে আশেপাশে।
প্রিয় পাঠক, আপনি নিশ্চয়ই আপনার পাশেও এরকম প্রতিনিয়তই লোকজন দেখতে পান। এসব ভাইয়েরা নিরেট সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত। এ সকল সাধারণ মানুষের জীবন মানের উন্নতির কথা যাদের ভাবার কথা, তারা কি সঠিকভাবে তাদের জন্য ভাবেন কখনো? অথচ এ অতি সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত মানুষগুলোর করের টাকায়ও সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার অংশ থাকে।
আমরা একটু ভিন্ন দিকে নজর দিলে দেখতে পাব এ ১৫ হাজার টাকা বেতনের অনেক সরকারি কর্মচারীরা বর্তমান সমাজে বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন। প্রশ্ন হলো কিভাবে? দুর্নীতিবাজ কর্মচারীরা দুর্নীতির মাধ্যমে অসৎ উপায়ে টাকা উপার্জন করেন। এবং সে টাকায় তারা জীবন যাপন করে। ইদানিং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই আমরা দেখতে পাচ্ছি এরকম অনেক ঘটনা। তাহলে এবার ভাবুন মাসে সমপরিমাণ আয়ের দুজন ব্যক্তির মধ্যে সামাজিক ব্যবধান কতটা প্রকট! অথচ বাহির থেকে তৃতীয় ব্যক্তি তাদের দুজনকে দেখে কখনও বিশ্বাস করতে পারবেন না যে, তাদের উভয়ের মাসিক মূল উপার্জন টাকার অংকে সমপরিমাণ।
আরও পড়ুন <<>> গাদ্দার নয়, বীর হিসেবে স্মরণীয় থাকুন
মাস প্রতি সমপরিমাণ আয়ের দুজন মানুষের আর্থ-সামাজিক জীবনযাপন পদ্ধতি একই রকম হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এ ভিন্ন বাস্তবতা সামাজিক ব্যবস্থাপনার ভিন্ন চিত্রায়ন করে। যা সম আয়ের মানুষের মর্যাদার তারতম্য ঘটায়। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের সঠিক ব্যবস্থার অভাবে সামাজিক বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক ভারসাম্য বিনষ্ট হয়।
দেশে আইন ঠিকই আছে কিন্তু তার সঠিক প্রয়োগ, যথোপযুক্ত তদারকি ইত্যাদির অভাব। সামাজিক বৈষম্য নিরসনে সরকারের উচিত আইনের সঠিক প্রয়োগ ঘটনা। আইন প্রয়োগে কোন ছাড় নয়। আইন যখন সমভাবে সবার উপরে প্রয়োগ হবে, তখন সে খেটে খাওয়া ইমান আলী এবং দুর্নীতিবাজ বেইমান আলীর মর্যাদার তারতম্য ঘটবে না। প্রয়োজন বৈষম্যহীন ব্যবস্থা কায়েম করা, যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষিত হবে এবং সামাজিক মর্যাদা নিয়ে দেশের নাগরিকরা সুখে শান্তিতে নিজের মাতৃভূমিতে বসবাস করবো। নতুন বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রত্যাশা, সবার জন্য শুভকামনা রইলো।
লেখক:
এম এম এ শাহজাহান, প্রকৌশলী
মার্কেটিং অ্যাডভাইজার, ফাইন গ্রুপ।




























