স্কুল কলেজে অশিক্ষিত সভাপতি: কার স্বার্থে?
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রবিধানমালা -২০২৪ রিভিউ সংক্রান্ত একটি সভায় গতকাল শিক্ষামন্ত্রী ডঃ আ ন ম এহছানুল হকের উপস্থিতিতে একটি অনাকাঙ্খিত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ততি এমন—এখন থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে সভাপতি পদে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনও বালাই থাকবে না।
নিউজটি পড়ে সত্যিই হতবাক হয়েছি। স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে - কেনো এ সিদ্ধান্ত, কার পরামর্শে এ ধরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে? শিক্ষা ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের উদ্দেশ্যে এমন প্রস্তাবনা কার? কাদের কল্যাণার্থে? কেনোই বা এমন প্রস্তাব গ্রহণ করে সোশ্যাল মিডিয়া উত্তপ্ত করা হলো? যদিও বা আমার উক্তিগুলো শিক্ষামন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছাবে না—তবুও প্রশ্ন রেখে গেলাম।
লিখতে দ্বিধা করছি না যে, আমার জানামতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দারোয়ান, দফতরি ও ক্লিনারের শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণী পাস্। অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষককে কেনো অষ্টম শ্রেণীর চেয়েও কম শিক্ষিত বা সম্পূর্ণ অশিক্ষিত লোককে সভাপতি হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য করা হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে এর চেয়ে অপমানকর সিদ্ধান্ত কি হতে পারে?
তাছাড়া, পদাধিকার বলে একজন সভাপতি হলেন প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষকের নিয়োগকর্তা। খোদ সভাপতিই যদি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে শিক্ষিত না হন, কিভাবে তিনি এমন দায়িত্ব পালন করবেন? নিয়োগপূর্বে তিনি কিভাবে একজন যোগ্য অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষকের মূল্যায়ন করবেন? শিক্ষার মানোন্নয়নে কিভাবে তিনি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে মনস্তাত্বিক সম্পর্ক গড়ে তুলবেন? কেনোনা, আজকের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রায় সকল প্রধান শিক্ষক মাস্টার্সসহ বিএড ও এমএড প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হয়। অর্থাৎ লেখাপড়া করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একজন প্রধান শিক্ষক/অধ্যক্ষকে ৬ থেকে ৮ বছর পড়াশুনা এবং কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞ হতে হয়। তাদের বডি ল্যঙ্গুয়েজ বোঝার ক্ষমতা একজন অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত সভাপতির না থাকারই কথা।
অথচ তারই নিয়োগকর্তা হবেন তার চেয়েও কম শিক্ষিত বা একেবারেই শিক্ষা ডিপার্টমেন্ট নিয়ে কোন ধারণা নেই এমন একজন অযোগ্য লোক। এটি কি দেশ ও জাতিকে সুশিক্ষিত করার কোন উদ্যোগ? এর ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যত কি হবে? শিক্ষার মান কেমন হবে? দেশে কি শিক্ষিত লোকের এতই অভাব যে শিক্ষাগত যোগ্যতাহীন কাউকে সভাপতি করে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে দূর্বল থেকে দূর্বলতর করতে হবে?
আরও পড়ুন <<>> শিক্ষা ছাড়াই হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি
প্রত্যেক গ্রামে, পাড়া ও মহল্লায় বহু গ্রাজুয়েট ও মাস্টার্স পাস্ সুশিক্ষিত পুরুষ ও মহিলা থাকা সত্বেও কেন নিম্নশিক্ষিত বা অশিক্ষিত লোকদের আমদানি করতে হবে? আমি সন্দেহ করছি, এমন সিদ্ধান্তে আগামীতে এলাকার মাস্তান, বাটপার, চাঁদাবাজদের পথ উন্মুক্ত হবে। তারা জোর করে কিংবা লবিংয়ের মাধ্যমে কমিটির সভাপতি হবেন। প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় উন্নয়ন কর্মকান্ডের টেন্ডার নিবেন, শিক্ষক নিয়োগ, ছাত্রভর্তিসহ সকল কার্যের দখল নিবে। এটিকে রুখতে শিক্ষামন্ত্রীকে স্বাধীনভাবে চিন্তার পাশাপাশি দেশের প্রকৃত শিক্ষাবিদদের সাথে আলোচনা করতে হবে।
এমনিতেই বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। একটি বিষয় জেনে অনেকের কাছেই খারাপ লাগবে—বাংলাদেশ থেকে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত অনেক শিক্ষার্থী প্রবাসে লেখাপড়া করতে এসে অনেক সময় ক্রেডিট সমস্যায় ভুগে। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে বিদেশে পড়তে আসা শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ করে পুনরায় দুটি বা তিনটি বিষয়ে আবারও স্কুল পর্যায় থেকে ক্রেডিট নেয়ার কথা জানিয়ে দেয়া হয়। এর কারণ তুলনামূলক শিক্ষায় আধুনিক শিক্ষার সাথে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা বহুগুণ পিছিয়ে আছে। এমতাবস্থায় শিক্ষাকে জাহেলিয়াত যুগে ফেরত নিতে প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠান প্রধানকে কার নিয়ন্ত্রণে দেয়ার জন্য বর্তমান প্রবিধানকে উন্নতকরণ না, উল্টো বাতিল করে দেয়া হচ্ছে? আশা করি বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে .আমাদের আশা-ভরসার স্থল নবগঠিত সরকার সুশিক্ষিত জাতি গঠনে ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।
লেখক:
এডুকেশন স্পেশালিস্ট
টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ড, ক্যানাডা।




























