আ.লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের অধ্যাদেশ সংশোধনীসহ পাস হচ্ছে সংসদে
সংসদে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও আইনি সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত মিলছে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধের বিধান থাকা ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ কিছু সংশোধনী যুক্ত করে পাসের সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। একই সঙ্গে গুম প্রতিরোধে কঠোর শাস্তির বিধান থাকা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ আপাতত স্থগিত রাখার প্রস্তাব এসেছে।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটির প্রধান এমপি জয়নুল আবদিন চূড়ান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার পর কমিটি তাদের সুপারিশ তুলে ধরে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের নাম উল্লেখ করে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের যে ধারা ছিল, সেটিতে কিছু পরিমার্জন আনা হচ্ছে। তবে সংশোধনীগুলোর বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। মূল অধ্যাদেশে সরকারকে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সভা, সমাবেশ, মিছিল ও প্রকাশনা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ কমিটি এটি বাতিল না করে সংশোধনের মাধ্যমে স্থায়ী আইনে পরিণত করার পক্ষে মত দিয়েছে। ফলে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথ কার্যত খুলে যাচ্ছে।
অন্যদিকে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি এ অধিবেশনে আর কার্যকর হচ্ছে না। এ আইনে গুমকে জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং সর্বনিম্ন শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান ছিল। বিশেষ কমিটি এটিসহ মোট ১৬টি অধ্যাদেশ আপাতত অনুমোদন না দিয়ে পরে পূর্ণাঙ্গ বিল হিসেবে আনার সুপারিশ করেছে।
কমিটির মতে, মানবাধিকার কমিশন আইন, তথ্য অধিকার আইন এবং গুমবিরোধী আইন—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও গভীর পর্যালোচনা প্রয়োজন। তড়িঘড়ি করে আইন পাস না করে বিস্তারিত আলোচনা শেষে সংসদে বিল আকারে তোলা উচিত। ফলে গুমবিরোধী কঠোর আইনের বাস্তবায়ন আপাতত অনিশ্চয়তায় পড়ল।
মানবাধিকার কর্মীরা আশঙ্কা করছেন, এ স্থগিত সিদ্ধান্তে গুমের বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইনটি বাতিল করা হয়নি, বরং প্রক্রিয়াগত কারণে পরে আবার সংসদে আনা হবে।
এদিকে ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সংশ্লিষ্ট বিচারক নিয়োগ ও পৃথক সচিবালয় গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ৪টি অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। আরও ১৬টি অধ্যাদেশ, যার মধ্যে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংক্রান্ত বিষয়ও রয়েছে, সেগুলো আপাতত স্থগিত বা ‘শেলভড’ রাখা হচ্ছে।
বাতিলের তালিকায় থাকা অধ্যাদেশগুলোর লক্ষ্য ছিল বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বাড়ানো, প্রধান বিচারপতির অধীনে পৃথক সচিবালয় গঠন এবং বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা আনা। ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠনের প্রস্তাবও এর অংশ ছিল। কিন্তু বিশেষ কমিটির সুপারিশে এসব উদ্যোগ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০টি অধ্যাদেশের বিষয়ে বিরোধী দলীয় সদস্যরা ভিন্নমত দিয়েছেন। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা বিচার বিভাগ ও পুলিশ কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের বিরোধিতা করেছেন।
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, আগামী ৬ এপ্রিল থেকে পর্যায়ক্রমে এসব বিল সংসদে উত্থাপন করা হবে। সংবিধান অনুযায়ী, অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশ অনুমোদন বা বাতিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক উদ্যোগগুলো এখন সংসদীয় বিতর্ক, সংশোধন ও রাজনৈতিক সমঝোতার নতুন পরীক্ষায় পড়তে যাচ্ছে।
সবার দেশ/এফও




























