কোন পথে যাবে ওয়াশিংটন?
পরাজয় স্বীকার না আক্রমণ— দোটানায় ট্রাম্প
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা Ayatollah Ali Khamenei-কে হত্যার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের শাসনব্যবস্থাকে বড় ধরনের আঘাত দিয়েছে—এমনটাই মনে করছেন অনেকে। কিন্তু এই আঘাত কি চূড়ান্ত, নাকি কেবল শুরু? এ প্রশ্নের মুখে এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই দোটানায়।
তার সামনে আপাতত দুটি পথ খোলা। এক, খামেনির মৃত্যুকে কৌশলগত জয় ঘোষণা করে যুদ্ধ থামিয়ে দেয়া। দুই, শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি বদলে দিতে আরও বড় পরিসরে সামরিক অভিযান চালানো। সমস্যা হলো—দুটোরই রাজনৈতিক ও সামরিক খরচ বিপুল।
ট্রাম্প সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। কিন্তু এ বক্তব্য কতটা বাস্তবসম্মত? পেন্টাগনের ভেতরের সতর্কবার্তা বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে, তা বড়জোর এক থেকে দুই সপ্তাহের উচ্চমাত্রার সংঘাত টিকিয়ে রাখতে সক্ষম। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে যেতে হলে নতুন করে রসদ, ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জড়ো করতে হবে—যার জন্য সময় এবং অর্থ দুটোই প্রয়োজন।
আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো ‘অসম যুদ্ধ’। কয়েক হাজার ডলারের ড্রোন ভূপাতিত করতে মিলিয়ন ডলারের Patriot missile system ব্যবহার করতে হচ্ছে। এ অর্থনৈতিক বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। প্রতিটি হামলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ব্যয় বাড়ছে, আর ইরান তুলনামূলক কম খরচে চাপ ধরে রাখছে।
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো—যেমন Saudi Arabia ও United Arab Emirates—ইতোমধ্যেই আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার উদ্বেগে রয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, তারা ওয়াশিংটনের ওপর যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার চাপ বাড়াচ্ছে। কারণ, তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
ইরানের কৌশলও স্পষ্ট: একাধিক অভিমুখে হামলা, মিত্র দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো এবং আকাশ প্রতিরক্ষাকে ক্লান্ত করে তোলা। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এখন ইরান সে হুমকির পাল্টা বার্তা দিচ্ছে—‘রেজিম চেঞ্জ’ মানেই উপসাগর জুড়ে আগুন।
তবে এ কৌশল ইরানের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। যদি উপসাগরীয় দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সংঘাত বহুগুণ বিস্তৃত হতে পারে। সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ নিজেদের সামরিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
আরেকটি অজানা মাত্রা হলো ইসরায়েলের ভূমিকা। আকাশপথে ইরানের প্রতিরক্ষা দুর্বল করে দিয়ে ভেতরে বিদ্রোহ উসকে দেয়ার কোনও পরিকল্পনা আছে কি? যদি এমন কিছু ঘটে, তাহলে সংঘাত সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে—এমনকি ইরান খণ্ডিত হয়ে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিতেও পড়তে পারে। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সমন্বিত বিদ্রোহের লক্ষণ দেখা যায়নি।
এ যুদ্ধের লক্ষ্যও অসম। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য ‘জয়’ মানে শাসনব্যবস্থার পতন। কিন্তু ইরানের বর্তমান কাঠামোর জন্য কেবল টিকে থাকাই যথেষ্ট—তা যত ক্ষয়ক্ষতিই হোক না কেনো। সময় এখানে তেহরানের পক্ষে কাজ করতে পারে, যদি তারা রাষ্ট্রীয় কাঠামো অটুট রাখতে সক্ষম হয়।
এদিকে দীর্ঘ যুদ্ধ মানে বাড়তি মার্কিন প্রাণহানি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন ধাক্কা। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ট্রাম্প চাপে পড়তে পারেন। বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রশ্নে মার্কিন জনমত দ্রুত বদলে যেতে পারে—বিশেষত যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়।
সব যুদ্ধেরই একটি সীমা আছে—অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক। প্রশ্ন হলো, সে সীমায় পৌঁছানোর আগে কি ওয়াশিংটন পিছু হটবে, নাকি দ্বিগুণ শক্তিতে এগোবে? আর যদি ইরানের শাসনব্যবস্থা সব চাপ সত্ত্বেও টিকে যায়, তাহলে ‘জয়’ শব্দটির অর্থ তখন নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হবে—ওয়াশিংটনের জন্যও, তেলআবিবের জন্যও।
সবার দেশ/এফও




























