কোরবানির ধর্মীয়, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব
হযরত ইব্রাহিম আ. এর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল আ. কে কুরবানির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ আমলটি মহান আল্লাহ সামর্থবান মুসলিমের জন্য ত্যাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ হিসেবে পশু কোরবানির মাধ্যমে নির্ধারণ করেছেন। ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হচ্ছে কোরবানি।
প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখ থেকে শুরু করে তিন দিনের মধ্যে মুসলিমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্ধারিত পশু কোরবানি করে থাকেন। এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বরং এর মাধ্যমে ব্যক্তি, সমাজ ও অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব পড়ে। কুরআন ও হাদিসে কোরবানির গুরুত্ব সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
কোরবানির ধর্মীয় গুরুত্ব:
"কোরবানি" শব্দটি এসেছে আরবি “قرب” (কুরব) থেকে, যার অর্থ হচ্ছে ‘নিকটবর্তী হওয়া’। অর্থাৎ কোরবানি হলো এমন একটি ইবাদত যা দ্বারা বান্দা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। মূলত, এটি হযরত ইব্রাহিম আ. ও ইসমাইল আ.-এর আত্মত্যাগের স্মরণে পালিত হয়, যারা আল্লাহর আদেশ পালনের জন্য নিজের প্রাণ পর্যন্ত উৎসর্গে প্রস্তুত ছিলেন।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,
‘তোমরা বলো, আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মৃত্যু কেবল আল্লাহরই জন্য, যিনি সকল সৃষ্টির পালনকর্তা।’ (সূরা আন’আম: ১৬২)
মহান আল্লাহ আরও বলেন,
‘প্রত্যেক জাতির জন্য আমি কোরবানির নিয়ম নির্ধারণ করেছি যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুষ্পদ পশুর ওপর আমার নাম স্মরণ করে। তোমাদের ইলাহ তো এক ইলাহ; অতএব তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ করো; আর অনুগতদেরকে সুসংবাদ দাও।’(সূরা হাজ্জ: ৩৪)
মহান আল্লাহর নেয়ামত সম্পর্কে মুহাম্মদ স. কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ বলেন,
‘নিশ্চয় আমি আপনাকে আল-কাউসার দান করেছি। কাজেই আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামায আদায় করুন এবং কুরবানী করুন। (আপনার নাম-চিহ্ন কোনোদিন মুছবে না, বরং) আপনার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীরাই নির্বংশ’। (সূরা কাউসার: ১-৩)
এ আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, কোরবানি একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যা ইসলামের মৌলিক উপাদানগুলোর একটি।
হাদিসে কুরবানির গুরুত্ব:
রাসূলুল্লাহ (সা.) কুরবানিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:
‘আল্লাহর কাছে কোরবানির দিনে কোরবানির চেয়ে অধিক প্রিয় কোনো আমল নেই। কেয়ামতের দিন কোরবানির পশু তার শিং, পশম ও খুরসহ উপস্থিত হবে। আর পশুর রক্ত জমিনে পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়। সুতরাং আনন্দচিত্তে কোরবানি করো।’ (তিরমিজি: ১৪৯৩)
তিনি আরও বলেন:
‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’(ইবন মাজাহ: ৩১২৩)
এ হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে, কোরবানি শুধু একটি ঐতিহ্য নয় বরং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত।
কুরবানির সামাজিক গুরুত্ব:
কোরবানির মধ্যে ব্যক্তির ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণের পাশাপাশি সামাজিক গুরুত্ব নিহিত রয়েছে। যেমন-
১. সম্প্রীতি ও সহানুভূতির শিক্ষা:
কোরবানির মাংস নিজে খাওয়ার পাশাপাশি আত্মীয়, গরিব-দুঃখী ও পাড়াপ্রতিবেশির মাঝে বণ্টন করার নির্দেশ রয়েছে। এর মাধ্যমে সমাজে দরিদ্রদের প্রতি সহানুভূতি বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
২. সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় হয়:
কোরবানির পশু জবাই, মাংস বণ্টন ও একত্রে ঈদের নামাজ আদায় সমাজে মুসলমানদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করে।
৩. ঈমানী ত্যাগের শিক্ষা:
কোরবানি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঈমানের দাবি পূরণে প্রয়োজন হলে আমাদের প্রিয় জিনিসকেও আল্লাহর রাস্তায় ত্যাগ করতে হবে। এ ত্যাগ শুধু পশু কুরবানিই নয়, প্রয়োজনে নিজের জান ও মাল দিয়ে সামাজিক কল্যাণে এগিয়ে আসার শিক্ষাই হচ্ছে কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা।
কোরবানির অর্থনৈতিক গুরুত্ব:
কোরবানিকে কেন্দ্র করে একটি দেশে অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ সাধিত হয়। যেমন-
১. কৃষি ও পশু খামার উন্নয়ন:
কোরবানিকে কেন্দ্র করে গবাদি পশুর চাহিদা বৃদ্ধি পায়, ফলে খামারিরা লাভবান হন এবং দেশে প্রাণিসম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
২. অর্থনীতির চাকা সক্রিয় হয়:
পশু ব্যবসায়ী, গাড়ি চালক, শ্রমিক, কসাই, চামড়া শিল্প প্রভৃতি নানা স্তরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, যার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হন।
৩. দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক হয়:
কোরবানির মাংস ও অন্যান্য উপকরণ দরিদ্র শ্রেণির মাঝে বণ্টনের মাধ্যমে সম্পদের প্রবাহমানতা ঘটে, যা সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য আনে।
৪. শিল্পের উন্নয়ন:
পশুর চামড়া, হাড়, শিং ইত্যাদির যোগানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরণের শিল্প গড়ে ওঠে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
৫. পুষ্টি ঘাটতি পূরণ করে জনস্বাস্থ্যের উন্নতি:
কোরবানির মাধ্যমে প্রাণিজ আমিষের যোগান বৃদ্ধির ফলে পুষ্টি ঘাটতি পূরণ হয় এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতি লাভ করে।
কোরবানি সম্পর্কে কিছু ভুল প্রচলন:
কুরবানির মূল উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা। লোক দেখানো বা আত্মগরিমা প্রকাশের সুযোগ এতে নেই। কিন্তু বর্তমানে কোরবানির পশু ক্রয়ের পর এর মূল্য উল্লেখপূর্বক সোশ্যাল মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বাজারের সবচেয়ে দামী পশুটি কোরবানি দিতে পেরে অনেকে আত্ম অহংকারে ভোগেন। অনেকে অন্যের ছোট পশু দেখে টিপ্পনি কাটেন এ বলে যে, আরে ও তো বাছুর কিনেছে। আবার অনেকে মিসকিনকে লাইনে দাঁড় করিয়ে ভিডিও তৈরি করেন। এক টুকরা মাংসের জন্য পদদলিত হয়ে আহত নিহত হওয়ার ঘটনার কথাও শোনা যায়। অনেকে এসব দৃশ্য ভিডিও করে পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করেন।
কোরবানির মাংস নিয়ে সবচেয়ে মারাত্মক যে রেওয়াজটি কোনো কোনো সমাজে চালু আছে তা হলো কোরবানির মাংসা তিন ভাগ করে এক ভাগ বাধ্যতামূলকভাবে সমাজপতির কাছে প্রদান করা। যার উদ্দেশ্য হচ্ছে সামাজিক ভাবে গরীব লোকদের মধ্যে বণ্টন করা। উদ্দেশ্য মহৎ হলেও এ আচারটি ধর্ম সমর্থন করে না। কেরবানির মাংস বিলিবণ্টন বা ভোগের একচ্ছত্র অধিকার কোরবানি দাতার। তিনি চাইলে সব মাংস নিজে খেতে পারেন কিংবা ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করতে পারেন। তার পছন্দের বা কাছের কাউকে একটু বেশি দিতে পারেন। কিন্তু সামাজিক ভাগের নামে বাধ্যবাধকতা আরোপের ফলে তার এ অধিকারকে হস্তক্ষেপ করা হয়।
লেখক: কবি ও কথা সাহিত্যিক




























