সন্তানকে বদদোয়া দেবার পরিণতি
আমরা প্রতিদিন এতো এতো গুনাহ করি। গুনাহের সাগরে ডুবে থাকি। অথচ এমনভাবে চলি বা নিজেকে মনে করি যেনো মনে হয় জান্নাতের পথে আছি অথচ হাটছি জাহান্নামের পথে! এ জাহান্নামের পথে যাত্রার একটা বড় কারন অহমিকা বা দাম্ভিকতা!
আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমতা দেন আর আমরা ক্ষমতা পেয়ে দাম্ভিক হয়ে যাই। কারন যত গুনাহই আমরা করি না কেনো- মহান আল্লাহ তো মাথার উপর থেকে ছাদ তুলে ফেলেন না। আলো-বাতাস বন্ধ করে দেন না। রিযিক বন্ধ করে দেন না। শ্বাস বন্ধ করে দেন না। অসংখ্য নেয়ামত দিয়ে তিনি তার বান্দাকে রহমানুর রহীমের ছায়ায় বাঁচিয়ে রাখেন!তবুও কি আমরা তার নেয়ামতের শোকর করি! কতটুকু?
না!আমরা যেভাবে শোকর করা উচিত, সেভাবে করি না। করতে পারি না। কারন আমরা জ্ঞান অর্জন করলেও শরীয়াহ মানতে চাই না বা গাফিলতি করি। যেকারনে আমরা নেয়ামত পেয়েও তা হারিয়ে ফেলি। বান্দার উপর মহান আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামতের মধ্যে একটি হলো- আমাদের সন্তানেরা।
একটিবার ভেবে দেখুন- সন্তানহীন পরিবার বা জীবন কেমন কাটে?
কতো মানুষ আছে- যারা পাগলের মতো হয়ে থাকে একটি সন্তানের মুখ দেখার জন্য। কতো হাহাকার! আবার আল্লাহ দিয়েও অনেক সময় বুক খালি করে নিয়েও যান। সহ্য করতে পারেন সে ব্যথা? অথচ এ সন্তানকেই আমরা ছোট-খাট বিষয়ে অধৈর্য হয়ে বদদোয়া দিয়ে বসি।
আমরা কেমন বাবা-মা! কেমন মানুষ? যদি সন্তানকে বদদোয়া ই দিবেন - কেনো নিলেন সন্তান? মা-বাবা হতে হলে তো চরম সহ্যশীল হতে হয়!
হাসির ছলে বা রাগের বশেও বাবা-মায়ের বদদোয়া করা উচিত নয়, কারণ এটি একটি মারাত্মক গুনাহের কাজ। কারন বাবা-মায়ের সন্তুষ্টিতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন এবং তাদের অসন্তুষ্টিতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন। তাদের বদদোয়া বা অভিশাপ লেগে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে অনেক আফসোস ডেকে আনতে পারে।
ইসলাম আমাদের নিজেদের জন্য, সন্তানের জন্য এবং সম্পদের জন্য বদদোয়া করতে নিষেধ করেছে। রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন,
তোমরা নিজেদের জন্য বদদোয়া করো না, নিজেদের সন্তানদের জন্য বদদোয়া করো না, এবং নিজেদের সম্পদের জন্যও বদদোয়া করো না; এমন হতে পারে যে, তখনই তা আল্লাহর পক্ষ থেকে দান ও কবুল হওয়ার একটি মুহূর্ত, (ফলে) তোমরা যে বদদোয়া করবে, আল্লাহ তা সঙ্গে সঙ্গেই তোমাদের জন্য কবুল করে নেবেন। (সহীহ মুসলিম)
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন:
তিন ব্যক্তির দোয়ার কবুল হওয়া নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই: (১) মজলুমের দোয়া, (২) মুসাফিরের দোয়া, এবং (৩) পিতা মাতার সন্তানের জন্য করা দোয়া। (সুনানে ইবনে মাজা)
এ দুটি হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, যেমনিভাবে মা-বাবার দোয়া কবুল হয়, তেমনিভাবে তাদের বদদোয়াও কবুল হয়ে যায়।
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বনি ইসরাঈলের মধ্যে জুরাইজ নামের এক ব্যক্তি ছিলেন। একদিন তিনি নামাজ পড়ছিলেন। এমন সময় তার মা তাকে ডাকেন। কিন্তু তিনি তার ডাকে সাড়া দিলেন না। তিনি বলেন, ‘সালাত আদায় করবো, না কি তার জবাব দেবো? তারপর মা তার কাছে এলেন এবং বলেন, ‘হে আল্লাহ! তাকে মৃত্যু দিয়ো না, যে পর্যন্ত তুমি তাকে কোনও পতিতার মুখ না দেখাও।
আরও পড়ুন <<>> ঈমান ও আমলে সালেহের গুরুত্ব
একদিন জুরাইজ তার ইবাদতখানায় ছিলেন। এমন সময় এক নারী বলেন, আমি জুরাইজকে ফাঁসিয়ে ছাড়বো। তখন সে তার কাছে গেলো এবং তার সঙ্গে কথাবার্তা বললো। কিন্তু তিনি অস্বীকৃতি জানালেন। তারপর ওই নারী এক রাখালের কাছে এসে স্বেচ্ছায় নিজেকে তার হাতে সপে দিলো। তার কিছুদিন পর সে একটি ছেলে প্রসব করলো। তখন সে বলে বেড়াতে লাগল যে এ ছেলে জুরাইজের!
এ কথা শুনে লোকেরা জুরাইজের কাছে এলো এবং তার ইবাদতখানা ভেঙে তাকে বের করে দিলো ও তাকে গালাগাল করলো। এরপর তিনি (জুরাইজ) অজু করলেন এবং সালাত আদায় করলেন। তারপর তিনি ছেলেটির কাছে এসে বলেন, হে ছেলে! তোমার পিতা কে? সে জবাব দিলো, রাখাল। তখন লোকেরা বললো, আমরা তোমার ইবাদতখানা সোনা দিয়ে তৈরি করে দেবো। জুরাইজ বলেন, না মাটি দিয়েই তৈরি করে দাও (যেমনটা আগে ছিলো)। (বুখারি, হাদিস : ২৪৮২)
আসলে তার এ মহাপরীক্ষায় পড়ার কারণ ছিলো তার মায়ের বদদোয়া।
তাছাড়া বিনা কারণে যারা কথায় কথায় অভিশাপ দেয় তারা বড় অপরাধী এবং নিজেরাই অভিশাপের জন্য উপযুক্ত হয়ে যায়। কারণ কাউকে অভিশাপ দেয়া হলে আর সে অভিশাপের যোগ্য না হয় অভিশাপ আবার অভিশাপকারীর উপর চলে আসে। রাসূল (স.) বলেন, বান্দা যখন কোন বস্তুকে অভিশাপ করে, তখন এ অভিশাপ আকাশের দিকে উঠে যায়। আর এ অভিশাপের জন্য আকাশের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় অতঃপর ঐ অভিশাপ যমীনের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। তার জন্য যমীনের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। অতঃপর ডানদিকে-বামদিকে যায় এবং যখন সেখানেও কোন রাস্তা না পায়, শেষ পর্যন্ত সে ব্যক্তি বা বস্তুর দিকে প্রত্যাবর্তন করে, যাকে অভিশাপ করা হয়েছে। যদি সে অভিশাপের উপযুক্ত হয়, তবে তার ওপর আপতিত হয় তা নাহলে অভিশাপকারীর দিকেই ফিরে আসে (আবূ দাঊদ, হা/৪৮৫০, সনদ হাসান ছহীহ)।
আর যারা মুমিন তারা কখনো অভিশাপ দেয় না
রাসূল (স.) বলেন,
একজন পূর্ণ মুমিন তিরষ্কার ও অভিশাপকারী এবং অশ্লীল গালমন্দকারী ও অহঙ্কারী হতে পারে না। (তিরমিযী, হা/১৯৭৭, ছহীহ)
সন্তান ভূল করবেই- এটা মেনে নিয়েই বাবা-মা হওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে- আমরা বাবা-মা হয়েছি বলে কি - আমাদেরও তো কতো ভূল হয়ে যায় না? সন্তান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অনেক বড় নেয়ামত। আমাদের উচিত সে নেয়ামতে কষ্ট পেলেও ধৈর্যশীল হওয়া। সন্তানকে সুপথে আনার জন্য শরীয়াহ অনুযায়ী হেদায়েত করা।কখনো বদদোয়া না করা।
মহান আল্লাহ আমাদের সন্তানদের দ্বীনের পথে অটুট রাখুক আর বাবা-মাকে ঈমানের সহিত তাদের মানুষ করার তৌফিক দিক।
গ্রীনরোড,ঢাকা




























