জাতীয় নির্বাচনে পিআর পদ্ধতি বা সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি!!
বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনৈতিক অসঙ্গতি, ক্ষমতার অস্বাভাবিক কেন্দ্রীকরণ ও ভোটের অপচয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা দূর করতে আনুপাতিক বা সংখ্যানুপাতিক (Proportional Representation - PR) নির্বাচন পদ্ধতি বাস্তবায়ন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের প্রায় ৮০টিরও বেশি দেশ ইতোমধ্যে এ পদ্ধতিতে নির্বাচন পরিচালনা করছে এবং ক্রমেই অধিক সংখ্যক রাষ্ট্র এ পদ্ধতির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে।
সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. নমিনেশন বাণিজ্যের অবসান ঘটবে।
২. জাতীয় সংসদের মোট ৩০০ আসনের ক্ষেত্রে শতভাগ ভোটের ভিত্তিতে এ ৩০০ আসন বণ্টিত হবে।
৩. কোনো দল ১% ভোট পেলে ৩টি আসন, ২% ভোট পেলে ৬টি আসন, ৩% ভোট পেলে ৯টি আসন—এভাবে যে দল যত শতাংশ ভোট পাবে, সে অনুযায়ী সংসদীয় আসন পাবে।
৪. এ পদ্ধতিতে প্রতিটি রাজনৈতিক দল এবং প্রত্যেক ভোটারের ভোটের প্রকৃত মূল্যায়ন নিশ্চিত হয়।
৫. প্রতিটি দল নির্বাচন শুরুর আগেই তাদের প্রার্থীর তালিকা নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দিবে।
৬. ব্যালট বক্স ছিনতাই বা কেন্দ্র দখলের মাধ্যমে কেউ বিজয়ী হতে পারবে না, কারণ সংসদীয় আসন নির্ভর করবে দলের মোট জাতীয় ভোটের ওপর।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে PR পদ্ধতির যৌক্তিকতা:
বাংলাদেশে বাস্তবতা হলো, বর্তমান পদ্ধতিতে কোনো দল ৩০-৪০ শতাংশ ভোট পেয়েও ২৫০+ আসন নিয়ে সরকার গঠন করতে পারে। অথচ আনুপাতিক পদ্ধতিতে সে দলের সংসদীয় আসন নামতে পারে ১০০-১২০ এর মধ্যে, যা প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করবে।
অনেকের আশঙ্কা, এ পদ্ধতিতে সংসদ দুর্বল হয়ে পড়বে। নেপাল বা ইরাকের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে—এমন মতামতও পাওয়া যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা এ ক্ষেত্রে ভিন্ন। দেশে নেপাল বা ইরাকের মতো জাতিগত, গোত্রীয় বা গভীর এথনিক বিভাজন নেই। ফলে অর্ধশতাধিক আঞ্চলিক বা ক্ষুদ্র দল সংসদে প্রবেশ করে অচলাবস্থার সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তদুপরি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় বড় দলসমূহ বরাবরই জোট সরকার গঠনের অভিজ্ঞতায় অভ্যস্ত।
উচ্চকক্ষ ও PR পদ্ধতির যৌক্তিক সংযোগ:
বর্তমানে বিএনপি উচ্চকক্ষ বা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব দিয়েছে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ এখনও উচ্চকক্ষের মতো কাঠামোতে অভ্যস্ত নয়। যদি উচ্চকক্ষ সংখ্যানুপাতিক ভিত্তিতে গঠন করা সম্ভব হয়, তবে নিম্নকক্ষেও একই নীতিতে নির্বাচন দিতে আপত্তির যৌক্তিকতা নেই। বরং এতে দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য, গণতন্ত্রের মান এবং প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির সরাসরি সুবিধাসমূহ:
-
ভোটের অপচয় বন্ধ হবে। যে দল যত শতাংশ ভোট পাবে, সে অনুযায়ী সংসদীয় আসন নিশ্চিত হবে। এতে প্রতিটি ভোট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
-
নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, কেন্দ্র দখল বা ব্যালট বক্স ছিনতাই করে বিজয়ী হওয়ার সুযোগ থাকবে না। কারণ স্থানীয় ফলের চেয়ে জাতীয় ভোট শতাংশই আসন বণ্টনের নির্ধারক হবে।
-
বড় বড় জনসমাবেশ, লোক ভাড়া করে প্রচারণা বা শোডাউনের প্রয়োজন কমবে।
-
ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বা এলাকার আধিপত্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমে যাবে, রাজনীতিতে অর্থবৃত্তের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আসবে।
-
উপজেলা পরিষদের কার্যকারিতা বাড়বে, কারণ এমপিদের আর স্থানীয়ভাবে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ থাকবে না।
-
৩০০ আসনে প্রায় ৩ লাখ ভোট চুরি করলে হয়তো ১টি আসনের পরিবর্তন হতে পারে, অথচ প্রচলিত FPTP (First Past The Post) পদ্ধতিতে মাত্র ১টি ভোট চুরি করেই একটি আসনের ফল বদলে দেওয়া সম্ভব। তাই ভোট চুরি বা জালিয়াতির সুযোগ কমে আসবে।
-
প্রবাসীরাও সহজে ভোট দিতে পারবে। যেহেতু পুরো দেশই একটি নির্বাচনী এলাকা, তাই অগ্রিম ভোটের সুযোগ বাড়বে এবং নির্বাচনের দিন অতিরিক্ত চাপও কমে যাবে।
-
কোনো সংসদ সদস্য মৃত্যুবরণ করলে বা পদত্যাগ করলে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হবে না; দলীয় তালিকা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যক্তি সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
-
ব্যক্তি-ভিত্তিক রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব কমবে, স্থানীয় পর্যায়ের কোন্দল, মারামারি, হানাহানি কমে আসবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কার ও সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন:
বর্তমান প্রচলিত নির্বাচন পদ্ধতি প্রকৃত গণতন্ত্রকে বিকৃত করছে। উদাহরণস্বরূপ, ১০০ জন ভোটারের মধ্যে—
-
বিএনপি পায় ৩০% ভোট
-
জামায়াত পায় ২৫%
-
গণঅধিকার পায় ২০%
-
ইসলামী আন্দোলন পায় ১৫%
-
অন্যান্য পায় ১০%
এই পরিস্থিতিতে মাত্র ৩০% ভোট পেয়েও বিএনপি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যায়, অথচ ৭০% ভোটার বিএনপিকে ভোট দেয়নি। এটি গণতন্ত্রের বড় ধোঁকাবাজি। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি এ অসঙ্গতি দূর করতে পারে।




























