বিএনপি-ঘেঁষা ব্যবসায়ীদের ক্ষোভে ফুঁসছে চট্টগ্রাম
হাসিনার দোসর আমিরুল হক ফের চেম্বারের মসনদে?
২২ জুলাই ২০২৪। বাংলাদেশ তখন এক ভয়াবহ অস্থির সময় অতিক্রম করছে। সারা দেশে চলছে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, সরকারের পতন দাবিতে উত্তাল রাজপথ। কোটা সংস্কার আন্দোলন পেরিয়ে সে দাবির ঢেউ গিয়ে আছড়ে পড়েছে শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের মূলে।
রাজপথে গুলি, মৃত্যুর মিছিল, রক্তে ভেসে যাচ্ছে শহর। মানুষ ঘরে বসে থাকতে পারছে না। প্রতিদিন রিকশাচালক থেকে কৃষক, শ্রমিক থেকে পেশাজীবী—সবাই যুক্ত হচ্ছেন ছাত্রদের সঙ্গে। সে সময় শেখ হাসিনার পায়ের নিচে জমি সরে যাচ্ছে, সরকারি কর্মকর্তারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, এমনকি তার অনুগত ব্যবসায়ী ও প্রশাসনিক লবিগুলোরও অনেকেই চুপসে যাচ্ছেন। হাসিনার প্রাণঘাতি অস্ত্রের মজুদও ফুরিয়ে এসেছে প্রায়। এমন সময় যখন রিকশাচালক থেকে দিনমজুর—সব শ্রেণির মানুষ রাজপথে নেমে পড়েছেন, তখন ক্ষমতাসীনদের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজধানীতে বসেছিলো এক অতি বিতর্কিত ব্যবসায়ী সম্মেলন নামে আওয়ামী লুটেরাদের হাট, যার প্রধান অতিথি ছিলেন শেখ হাসিনা নিজে।
বলা বাহুল্য, তিনি তখন রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা, চারদিক থেকে বিচ্ছিন্ন। কিন্তু সম্মেলনস্থলে উপস্থিত ব্যবসায়ীরা—দরবেশখ্যাত সালমান এফ. রহমান, হামীম গ্রুপের একে আজাদ, বসুন্ধরা গ্রুপের শাহ আলম, নাসা গ্রুপের নজরুল ইসলাম মজুমদারসহ—হাসিনার প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তারা শপথ নেন, ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করে মৃত্যুর পরও শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন রেখে যাবেন।
এ সভায় আরেকটি মুখ ছিলো, যার উপস্থিতি তখন তেমন আলোচিত না হলেও আজ তা নতুনভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে—তিনি হলেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মো. আমিরুল হক, সীকম গ্রুপের চেয়ারম্যান।
৩ লাখ টাকায় শুরু, হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য
মো. আমিরুল হক—একসময় নগরীর ফিরিঙ্গিবাজারের সাধারণ ব্যবসায়ী। শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে শ্রমিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে তিনি ১৯৯০ দশকের শেষ দিকে তিন লাখ টাকার মূলধনে নিজস্ব ব্যবসা শুরু করেন। এখন তার মালিকানায় অন্তত ৩০টি কোম্পানি। প্রিমিয়ার সিমেন্ট, ন্যাশনাল সিমেন্ট, ডেল্টা এলপিজি, ডেল্টা শিপইয়ার্ড, রূপসা এডিবল অয়েল, রোকনূর মেরিটাইম, বেঙ্গল স্যাক করপোরেশন, ট্রান্সচার্ট নেভিগেশন, প্রিমিয়ার পাওয়ার, চিটাগাং ব্যাগস—এগুলো তার বিশাল শিল্পসাম্রাজ্যের অংশ মাত্র।

তার ব্যবসা দ্রুত সম্প্রসারিত হয় মূলত শেখ হাসিনার শাসনামলে। সরকারি সুবিধা, ব্যাংক ঋণ, নীতিগত ছাড়—সব কিছুই যেন সহজলভ্য হয়ে ওঠে তার জন্য। আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকালেই তিনি হয়ে ওঠেন ‘বিজনেস টাইকুন’।
এ সময় আমিরুল হক ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে প্রতিষ্ঠিত হয় একের পর এক প্রতিষ্ঠান—সীকম হোল্ডিংস লিমিটেড, অ্যানশিয়েন্ট প্রোপার্টিজ, ডেল্টা অ্যাগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ, রোকনূর নেভিগেশন, রূপসা ট্যাঙ্ক টার্মিনাল অ্যান্ড রিফাইনারিজ—সবকিছু মিলিয়ে এক অদ্ভুত গতিতে বেড়ে ওঠে তার প্রভাব। এমনকি, বাগেরহাটের মোংলা শিল্প এলাকায় স্থাপিত রূপসা এডিবল অয়েল রিফাইনারির লাইসেন্সও তিনি পান বিশেষ সরকারি আশীর্বাদে।
শেখ হাসিনার ছায়ায় ব্যাংক ও বাণিজ্য লুট
শিপিং ও সিমেন্ট ব্যবসার আড়ালে আমিরুল হক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেন। এসব ঋণের বড় অংশই আসে আইএফআইসি ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, যেগুলোর পরিচালনায় ছিলেন শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব সালমান এফ. রহমান। অভিযোগ রয়েছে, ক্লিংকার ও ভোজ্য তেলের কাঁচামাল আমদানিতে আন্ডার-ইনভয়েস ও ওভার-ইনভয়েস পদ্ধতি ব্যবহার করে তিনি বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করেন। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাই ও কানাডায় তার মালিকানাধীন সম্পদের খোঁজ মিলেছে বলে জানায় একাধিক বাণিজ্য গোয়েন্দা সংস্থা।
আরও পড়ুন <<>> ‘রিফাইন্ড আওয়ামীলীগ’র গোপন অফিস মতলুবের ভবন!
তিনি ছিলেন শেখ হাসিনার প্রতিটি বড় ব্যবসায়িক প্রকল্পের ‘অঘোষিত অনুদানদাতা’। ২০২৪ সালের ‘আমি-ডামি’ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রচারে তিনি দিয়েছিলেন অন্তত ৫০ কোটি টাকা। অথচ আজ একই ব্যক্তি নিজেকে ‘হাসিনার নির্যাতিত ব্যবসায়ী’ হিসেবে প্রচার করছেন।
‘আনসার লীগ’ বিদ্রোহ ও আত্মগোপন
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পরপরই দেশে ঘটে একাধিক পাল্টা ক্যুর চেষ্টা। তখনই আলোচনায় আসে ‘আনসার লীগ’ নামের বিদ্রোহী সংগঠন। অভিযোগ রয়েছে, এর অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন আমিরুল হক।

২৩ আগস্ট তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তায় থাকা আনুমানিক ১৩০০ আনসার সদস্যকে গোপনে ঢাকায় পাঠান, উদ্দেশ্য ছিলো সচিবালয় ঘেরাও করে অন্তর্বর্তী সরকারকে অচল করে দেয়া। ‘দাবি-দাওয়ার’ আড়ালে এ পদক্ষেপ ছিলো একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র—এমনটাই জানায় নিরাপত্তা সংস্থার রিপোর্ট। পরদিন, ২৫ আগস্ট, ছাত্র-জনতা ও নতুন প্রশাসনের তৎপরতায় সে বিদ্রোহ দমন করা হয়।
এরপর কয়েক মাস আত্মগোপনে থেকে আমিরুল হক আবারও প্রকাশ্যে আসেন, এবং দাবি করতে শুরু করেন যে তিনি নাকি শেখ হাসিনার ‘অবিচারের শিকার’।
নতুন মিত্র, নতুন মুখোশ
২০২৫ সালের শুরু থেকেই আমিরুল হক নিজের অবস্থান পাল্টাতে শুরু করেন। তিনি যোগাযোগ করেন বিএনপিপন্থি এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতার সঙ্গে, যার আশীর্বাদেই পরে তিনি এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলওএবি) সভাপতি নির্বাচিত হন।
সভাপতি হওয়ার পরপরই এলপিজি সিলিন্ডারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়—১২০০ টাকা থেকে ১৪০০ টাকায়। এ মূল্যবৃদ্ধির ফলে ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট এক গোষ্ঠী কয়েকশ কোটি টাকার অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করে। সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা নাম না করে তার দিকেই ইঙ্গিত করে বলেন, এলপিজি খাতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জনগণের পকেট কেটে শত শত কোটি টাকা তুলছে।
আরও পড়ুন <<>> মাফিয়া হাসিনার সহযোগি ব্যবসায়ী ওরিয়ন গ্রুপের সাগর চুরি
উপদেষ্টার সে বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে যায়, ‘অসাধু ব্যবসায়ী’ বলতে তিনিই বোঝাচ্ছিলেন—এলওএবি সভাপতি আমিরুল হককেই।
উপদেষ্টাদের হুমকি, বন্দর রাজনীতিতে ফের সক্রিয়তা
গত ১২ অক্টোবর চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীদের এক সমাবেশে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের উদ্দেশে চরম উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। বলেন,
এখন ডিবি হারুনের ভয় নেই। আমরা জানি কে কোথায় যান, এনএসআই অফিসে কে ঢোকেন। উপদেষ্টা বা সচিব কেউ চট্টগ্রাম বন্দরে আসবেন না—আমি বাধা দেবো।
তার এ দম্ভোক্তি শুধু রাজনৈতিক বার্তাই নয়, বরং স্পষ্ট হুমকি হিসেবেই দেখা হয়। উপস্থিত ব্যবসায়ীদের অনেকেই পরে জানান, আমিরুল হকের বক্তব্যে ছিলো ‘পূর্বের হাসিনার শাসনের সময়কার গৌরব’ পুনরুদ্ধারের ছাপ।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানায়, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে তিনি বন্দরের মধ্যে আবারও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা শুরু করেছেন। তার নিয়ন্ত্রণে থাকা শ্রমিক ইউনিয়ন ও এলপিজি খাতের গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে বন্দর কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের প্রমাণও মিলেছে।
চেম্বার নির্বাচন: হাসিনার ছায়া থেকে নতুন রূপে
এখন তার নতুন লক্ষ্য—চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (সিসিসিআই)। এ সংস্থা শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, বরং দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। এখানকার নেতৃত্ব মানেই রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা।
চেম্বারের আসন্ন নির্বাচনে ‘ওয়ান টিম প্যানেল’ থেকে সভাপতি পদে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন আমিরুল হক। তার সঙ্গে রয়েছেন আরও ৩৬ জন প্রার্থী—বেশিরভাগই সীকম গ্রুপ ও প্রিমিয়ার সিমেন্টের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী। এ প্যানেলের নেতৃত্বে রয়েছেন আওয়ামী ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম ও আমীর হুমায়ুন চৌধুরী।
বিতর্ক এখানেই—আওয়ামী লীগের পতনের পরও কেন এ পুরোনো আনুগত্যধারীরা এখন বিএনপির ছায়ায় ব্যবসায়িক প্রভাব বিস্তারে ব্যস্ত?
চেম্বারের ভেতর বিএনপিপন্থি ব্যবসায়ীদের মধ্যে চলছে তীব্র অসন্তোষ। তাদের অভিযোগ, যারা শেখ হাসিনার পদলেহন করে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছে, আজ তারাই বিএনপির নাম ভাঙিয়ে নতুন প্রভাব তৈরি করছে। অথচ যারা হাসিনার সময় জেলে গেছেন, ব্যবসা হারিয়েছেন—তাদের কোনো জায়গা নেই।
‘হাসিনার উচ্ছিষ্টভোগী’ নাকি ‘নতুন কৌশলবিদ’?
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মহলে এখন একটাই প্রশ্ন—আমিরুল হক আসলে কোন শিবিরের মানুষ? তিনি কি সত্যিই রাজনৈতিকভাবে অবস্থান বদলেছেন, নাকি এটি কেবল নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার কৌশল?
অনেকে বলছেন, শেখ হাসিনার পতনের পরও তিনি সে পুরোনো নেটওয়ার্ক বজায় রেখেছেন। বিশেষ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ, শিপিং মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য খাতে তার প্রভাব এখনো অটুট। বিএনপিপন্থি নতুন প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে তিনি কেবল সময়ের সঙ্গে তাল মিলাচ্ছেন।
চেম্বারের নির্বাচন তাই হয়ে উঠেছে একটি রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র—যেখানে মূল লড়াই শুধু নেতৃত্বের নয়, বরং পুরোনো ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর পুনরুত্থান ঠেকানোর।
উপসংহার
শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী আমলে সুবিধাভোগী এ ব্যবসায়ী এখন নিজেকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন। অথচ তার মতো ব্যক্তিরাই একসময় সে ব্যবস্থার অর্থনৈতিক স্তম্ভ ছিলো, যা দেশে লুটপাট, অর্থপাচার ও রাজনৈতিক অনৈতিকতার সংস্কৃতি স্থায়ী করে দেয়।
চট্টগ্রাম চেম্বারের নির্বাচনে যদি এমন একজনের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, যিনি একই সঙ্গে হাসিনার অনুগত ও বর্তমান প্রশাসনের ‘ঘনিষ্ঠ’, তবে সেটি হবে কেবল ব্যক্তির নয়, বরং পুরো ব্যবসায়ী সমাজের নৈতিক পরাজয়।
বন্দরনগরী চট্টগ্রাম তাই এখন তাকিয়ে আছে—শেখ হাসিনার ছায়া থেকে উঠে আসা এ ‘নতুন রাজনৈতিক ব্যবসায়ী’ কি আবারও সে পুরোনো অন্ধকার ফিরিয়ে আনবেন? নাকি এবার সত্যিই বদল আসবে দেশের ব্যবসা রাজনীতির কাঠামোয়?




























