ছাতকে আওয়ামী নেতার পছন্দের চালককে বাঁচাতে মরিয়া এসিল্যান্ড
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে এক গাড়িচালকের কর্মকাণ্ড ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সরকারি কম্পিউটার ব্যবহারের অভিযোগ ওঠা সে চালক ইজাজুলকে ঘিরে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠতার কারণে তাকে রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা ফজলুর রহমান-এর আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ইজাজুলকে বিশ্বনাথ থেকে এনে ছাতক উপজেলা পরিষদের গাড়িচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো। এ নিয়োগের সময় পূর্বের চালক আবুল হোসেন চাকরি হারান। পরে সোশ্যাল মিডিয়া লাইভে এসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের চাকরি হারানোর কথা বলেছিলেন তিনি।
২০২৪ সালের ২৯ মে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব প্রত্যাহার করা হলেও চালক ইজাজুল থেকে যান উপজেলা পরিষদের কোয়ার্টারে। বর্তমানে স্থায়ী চালক না থাকায় তিনি দৈনিক ভিত্তিতে এসিল্যান্ডের গাড়িচালকের দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে অভিযোগ উঠেছে, এ সুযোগে তিনি শুধু গাড়ি চালানোতেই সীমাবদ্ধ নেই। নিয়মিতভাবে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের ‘মেঘনা কক্ষ’-এ সরকারি কম্পিউটার ব্যবহার করছেন। কখনও সংশ্লিষ্ট স্টাফদের উপস্থিতিতে, আবার কখনও তাদের অনুপস্থিতিতেও তাকে কম্পিউটারে কাজ করতে দেখা গেছে।
একাধিক সূত্র দাবি করেছে, ওই কম্পিউটার ব্যবহার করা হয় গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চিঠিপত্র টাইপিং ও ই-মেইল আদান-প্রদানের কাজে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, সরকারি জমির লিজ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের সারাংশ তিনি ইজাজুলের মাধ্যমে সংগ্রহ করেছেন।
এছাড়া দালালি ও তদবিরে জড়িয়ে পড়ে পুরো কার্যালয়ে তিনি প্রভাব বিস্তার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, একজন গাড়িচালকের এমন প্রভাব বিস্তার প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও তথ্য নিরাপত্তা—দুই ক্ষেত্রেই উদ্বেগ তৈরি করেছে।
গত ৩ মে অফিস চলাকালে সরকারি কম্পিউটারে কাজ করার সময় গোপনে ইজাজুলের একটি ভিডিও ধারণ করেন এক সেবাগ্রহীতা। পরে ভিডিওটি স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে পৌঁছালে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। সংবাদ প্রকাশ হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে মঙ্গলবার বিকেলে এসিল্যান্ড কার্যালয়ে গেলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম নিজেকে ‘কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার’ পরিচয় দিয়ে বলেন, ওই কম্পিউটারে কিছুই নেই। ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতেই পারে। এটি যে কেউ ব্যবহার করতে পারবে। চাইলে আপনারাও ব্যবহার করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, আমার স্থায়ী গাড়িচালক নেই। যে আছে, সে ডেইলি বেসিসের। প্রয়োজনে তাকে বাদ দিতে পারি, কিন্তু আমি চলবো কীভাবে?
প্রায় ২০ মিনিটের আলোচনায়ও তিনি বিষয়টিকে গুরুত্বহীন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ স্থানীয় সাংবাদিকদের। তার বক্তব্যকে অনেকে ‘দায়সারা’ ও ‘অপেশাদার’ বলেও মন্তব্য করেছেন।
তবে এ বিষয়ে অরুপ সিং, যিনি বর্তমানে ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন, বলেন, অফিসের দায়িত্ব পালনের জন্য আলাদা আলাদা লোক রয়েছে। গাড়িচালকের কাজ গাড়ি চালানো, কম্পিউটার পরিচালনা নয়। বিষয়টি তাকে সতর্ক করে দেয়া হবে।
অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এখনও তদন্ত কমিটি গঠন না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তি পার পেয়ে গেলে প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা আরও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
সবার দেশ/কেএম




























