Sobar Desh | সবার দেশ আন্তর্জাতিক

প্রকাশিত: ১৪:৫০, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৪:৫৩, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে গো-মাংসে কড়াকড়ি, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন নাগরিকরা

পশ্চিমবঙ্গে গো-মাংসে কড়াকড়ি, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন নাগরিকরা
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গোরুর মাংসের সরবরাহ ও বিক্রিতে কড়াকড়ির প্রভাব পড়েছে বাজার ও রেস্তোরাঁয়। সরবরাহ সংকট, জবাইয়ের ওপর বিধিনিষেধ এবং কসাইখানা ও ব্যবসায়িক লাইসেন্সসংক্রান্ত জটিলতায় কোলকাতাসহ বিভিন্ন এলাকায় গরুর মাংস পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে অনেক নাগরিক খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন। একই সঙ্গে গরুর মাংসের দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার গঠনের পর গরু জবাই ও মাংস বিক্রির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ কঠোরভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে গরুর মাংসের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কসাই, মাংস বিক্রেতা, খামারি এবং রেস্তোরাঁ মালিকেরা নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন।

কঠোর হয়েছে জবাইয়ের নিয়ম

গত ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৫০ সালের পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়। ওই নীতির আওতায় নির্দিষ্ট বয়স ও শারীরিক অবস্থার পশু ছাড়া গরু বা মহিষ জবাইয়ের জন্য ফিটনেস সনদ দেয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, ১৪ বছরের বেশি বয়সী, প্রজনন বা কাজের অনুপযোগী কিংবা গুরুতরভাবে পঙ্গু পশু ছাড়া গরু বা মহিষ জবাইয়ের অনুমতি পাওয়ার সুযোগ সীমিত। পাশাপাশি অনুমোদিত নির্ধারিত কসাইখানা ছাড়া অন্য কোথাও পশু জবাইয়ের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

সরকারের এ কঠোর অবস্থানের ফলে গরু জবাই ও মাংস সরবরাহের প্রচলিত ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বন্ধ পৌর কসাইখানা

কোলকাতার ট্যাংরা এলাকায় অবস্থিত শহরের একমাত্র পৌর কসাইখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। একই সঙ্গে কসাইদের ব্যবসায়িক লাইসেন্স নবায়নও আটকে রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোলকাতা পৌরসভার প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে লাইসেন্স নবায়নের প্রক্রিয়া থমকে গেছে। মেয়র ফরহাদ হাকিমের পদত্যাগের পর পৌরসভা ভেঙে দেয়া হয়েছে এবং আগামী ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। এর মধ্যেই কসাই ও মাংস ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স নবায়নের বিষয়টি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

ফলে বৈধভাবে গরুর মাংসের ব্যবসা পরিচালনা করা অনেক ব্যবসায়ীর জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

কেজিতে বেড়েছে ২৫০ রুপি পর্যন্ত

সরবরাহ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারদরে। কোলকাতায় আগে গরুর মাংস প্রতি কেজি প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ রুপিতে বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৩৫০ থেকে ৫০০ রুপিতে পৌঁছেছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

রেস্তোরাঁয়ও দাম বেড়েছে। এক প্লেট ভুনা মাংসের দাম আগে যেখানে প্রায় ১০০ রুপি ছিলো, এখন তা বেড়ে ১২০ রুপি হয়েছে।

তবে দাম বাড়লেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিক্রি আগের তুলনায় ব্যাপক কমেছে। অনেক এলাকায় গরুর মাংসের ব্যবসা ৫০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। নিরাপত্তা ও সামাজিক চাপের আশঙ্কায় অনেকে প্রকাশ্যে গরুর মাংস খাওয়া থেকেও বিরত থাকছেন।

মেনু থেকে বাদ গরুর মাংস

গরুর মাংসের সরবরাহ সংকট ও বিধিনিষেধের প্রভাব পড়েছে কোলকাতার ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁগুলোর ওপরও। অলি পাব ও জাম জামসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের মেনু থেকে গরুর মাংসের বিভিন্ন পদ বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে গরুর মাংসের বিভিন্ন পদ পরিবেশন করা এসব রেস্তোরাঁর জন্য বিষয়টি ব্যবসায়িকভাবেও বড় পরিবর্তন। গ্রাহকের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়া এবং আইনি জটিলতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প মাংসের পদ রাখছে।

গরুর বদলে ছাগলের ব্যবসা

গরুর মাংসের বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ব্যবসার ধরনও পরিবর্তন করছেন অনেকে। মাংস ব্যবসায়ী ও খামারিদের একটি অংশ লোকসান এড়াতে কম দামে গবাদিপশু বিক্রি করে এখন ছাগলের ব্যবসায় ঝুঁকছেন।

ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে গরু পালন, পশু কেনাবেচা এবং মাংস সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত পুরো বাজারব্যবস্থাতেই এর প্রভাব পড়তে পারে।

গোপন নেটওয়ার্কে বাড়ি বাড়ি সরবরাহ

আইনের কড়াকড়ির ফলে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মালদার মতো এলাকায় গরুর মাংস সরবরাহের ধরনও বদলে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিছু এলাকায় রাতের বেলায় গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গরুর মাংস পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। প্রকাশ্য বাজারের পরিবর্তে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও অনানুষ্ঠানিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছেন ক্রেতারা।

এতে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের জন্য মাংস সংগ্রহ কঠিন হচ্ছে, অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক বাজারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

বড় ভোক্তা মুসলিমসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী

সরকারি পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে গ্রামীণ এলাকার ১০ দশমিক ৪ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলের ৭ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার গরুর মাংস গ্রহণ করতো।

এ ভোক্তাদের মধ্যে মুসলিম জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি খ্রিস্টান, দলিত ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষও রয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গরুর মাংসের ভোক্তাদের একটি বড় অংশ মুসলিম জনগোষ্ঠীর হলেও এটি শুধু একটি সম্প্রদায়ের খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

ফলে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব বিভিন্ন শ্রেণি ও জনগোষ্ঠীর মানুষের ওপর পড়ছে।

দায় নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

ট্যাংরার কসাইখানা বন্ধ থাকা এবং কসাইদের লাইসেন্স নবায়ন না হওয়ার বিষয়ে কোলকাতা পৌরসংস্থার কমিশনার স্মিতা পান্ডে জানিয়েছেন, বিষয়টি প্রাণী সম্পদ বিকাশ বিভাগের আওতাধীন।

অন্যদিকে প্রাণী সম্পদ বিকাশ বিভাগের পরিচালক নিখিল কুমার শেঠ বলেছেন, কসাইখানা পরিচালনা এবং পশুর ফিটনেস সনদ দেয়ার যাবতীয় দায়িত্ব পৌরসংস্থার ওপর ন্যস্ত।

দুই দফতরের এ ভিন্ন অবস্থানের কারণে কসাইখানা চালু এবং লাইসেন্স নবায়নের বিষয়টি আরও জটিল হয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বদলে যাচ্ছে দীর্ঘদিনের খাদ্যসংস্কৃতি

গরুর মাংসের ওপর বিধিনিষেধ শুধু বাজারে পণ্য সরবরাহের সংকট তৈরি করেনি; এর প্রভাব পড়ছে মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও রেস্তোরাঁ সংস্কৃতিতেও। দাম বৃদ্ধি, সরবরাহের ঘাটতি এবং প্রকাশ্যে বিক্রি ও খাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক ভোক্তা বিকল্প মাংসের দিকে ঝুঁকছেন।

ব্যবসায়ীদের জন্যও পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একদিকে গরুর মাংসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ সীমিত, অন্যদিকে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় বৈধ ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফলে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের খাদ্যসংস্কৃতি ও মাংসের বাজারে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে—যার প্রভাব শুধু ভোক্তার পাতে নয়, কসাই, খামারি, মাংস বিক্রেতা ও রেস্তোরাঁ ব্যবসার ওপরও পড়ছে।

সূত্র: আল জাজিরা

সবার দেশ/এমকেজে

শীর্ষ সংবাদ:

ঢাবিতে ককটেল বিস্ফোরণ, ছাত্রদলের বিক্ষোভ
ঢাবিতে পরপর ৩ ককটেল বিস্ফোরণ
গ্যাস সরবরাহ বাড়লো জাতীয় গ্রিডে
ফ্যাসিস্ট আমলে৬০ লাখের বেশি মিথ্যা মামলা হয়েছে: আইনমন্ত্রী
ইমরানকে ‘ধীরে ধীরে হত্যা’ করা হচ্ছে-দাবি ছেলেদের
আবারও ৫ দিনের ছুটির ফাঁদে দেশ
জিন্নাহর ছবি ছেঁড়াকে ‘মব’ বললেন ডাকসু নেতারা
ভারতে বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিলো: আসিফ নজরুল
পশ্চিমবঙ্গে গো-মাংসে কড়াকড়ি, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন নাগরিকরা
জুলাই গণহত্যা: ওবায়দুল কাদের-আরাফাতসহ ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড
বিদ্যুতে লোপাট: ক্যাপাসিটি চার্জে ২.৯ লাখ কোটি টাকা
ভাঙা পিঠ-কাঁধ নিয়ে ৫০ ঘণ্টা ইরানের পাহাড়ে মার্কিন সেনা
তিন মাসে কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বাড়লো ৫ হাজার
চাঁদাবাজি-দখলবাজির কবর রচনার হুঁশিয়ারি জামায়াত আমিরের
বিমা খাতেও বিশাল দুর্নীতি হয়েছে আ.লীগের আমলে: অর্থমন্ত্রী
একাদশে ভর্তিতে ১০ লাখ আবেদন, ফল ১৭ সেপ্টেম্বর
ঢাকার উত্তর-দক্ষিণে জামায়াতের বাজি সেলিম-সাদিক
ওমানে বাংলাদেশিদের কনস্যুলার সেবা পাঁচ দিন বন্ধ
২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
কে গুলি করেছিলেন জিয়াউর রহমানকে, জানালেন মোজাফফর