কারফিউর আতঙ্কে গোপালগঞ্জ: রাত হলেই পুরুষশূন্য গ্রাম
গোপালগঞ্জে সহিংসতা-পরবর্তী কারফিউ পরিস্থিতিতে শহরের পাশাপাশি গ্রামের জীবনযাত্রাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রাতে ঘরছাড়া হয়ে পড়েছেন গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ। নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং পুলিশের গ্রেফতা এড়াতে তারা বাড়ির বাইরে অবস্থান করছেন—এমনটাই জানিয়েছেন সরেজমিনে কথা বলা অনেকেই।
শুক্রবার (১৮ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে গোপালগঞ্জ লাগোয়া একটি গ্রামের বাড়ির সদর দরজায় চার যুবকের আড্ডায় উঠে আসে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কের চিত্র। তারা জানান, কোনো অপরাধ না করেও পুলিশ গ্রেফতার করছে বলে আশঙ্কায় তারা রাতে বাড়িতে থাকেন না।
গোপালগঞ্জ সদর ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামে ঘুরে দেখা যায়, পুরুষরা কেউ বাড়িতে অবস্থান করছেন না। কেউ কেউ তো দিনের বেলাতেও বাড়িতে থাকেন না, আশ্রয় নিচ্ছেন আশপাশের অন্যান্য গ্রামে। নারীরা রয়েছেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়।
ঘোষেরচর গ্রামের বাসিন্দা মামুন শেখ বলেন, আমাদের গ্রামের একজন পুরুষও বাড়িতে থাকতে পারছে না। নারী-শিশুরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। আক্কাস মোল্লা ও বাবু নামে আরও দু’জন জানান, পুলিশ কোনও মামলা ছাড়াই তুলে নিয়ে যাচ্ছে, আর একবার ধরা পড়লে ছাড়াছাড়ি নেই।
মাঝিগাতী ইউনিয়নের গোপীনাথপুর গ্রামের মাসুম কাজী, নজরুল শেখ ও সিরাজ মিয়ার ভাষ্য, প্রতিদিন রাতে যৌথবাহিনী টহলে আসে। বৃহস্পতিবার আনিস কাজী নামে একজনকে ধরে নিয়ে গেছে।
কাঠি গ্রামের মিশকাত মোল্লা বলেন, ঘটনা ঘটিয়েছে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, অথচ শাস্তি পাচ্ছে সাধারণ মানুষ।
খাটিয়াগড় গ্রামে পুলিশের গাড়ি পোড়ানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওই এলাকার মানুষজন রয়েছেন চরম ভয়ের মধ্যে। প্রতিরাতে পুলিশ হানা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন রোজিনা বেগম ও শম্পা আক্তার। শম্পা বলেন, আমার স্বামী নির্দোষ হলেও ভয়ে বাইরে থাকে। মেয়েরা ঘরে থেকেও নিরাপদ নয়।
শহরের চিত্রও ছিল কঠোর নিয়ন্ত্রণে। দ্বিতীয় দিনের কারফিউতে ওষুধের দোকান ছাড়া সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিলো। রাস্তায় চলেনি কোনো যানবাহন। সন্ধ্যার পর বাইরে বের হলেই জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি করা হয়, উপযুক্ত কারণ দেখাতে না পারলে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
বিসিক ব্রিজ এলাকায় দায়িত্বরত এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কঠোর নজরদারিতে রয়েছি। শুধু জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে চলাচল করতে দেয়া হচ্ছে না।
কারফিউর মেয়াদ শনিবার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ নিয়ে দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বাড়ানো হলো। শুক্রবার দুপুর থেকে গোপালগঞ্জে সেনাবাহিনী, বিজিবির পাশাপাশি নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডও টহলে যোগ দেয়। মধুমতি নদীতে চলছে পানি পথে কঠোর তল্লাশি।
এদিকে সহিংস ঘটনার পর পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি পোড়ানো ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান পিয়ালসহ ৭৫ জনের নাম উল্লেখ করে ও ৪০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করা হয়েছে। মামলা করেছেন গোপালগঞ্জ সদর থানার পরিদর্শক আহম্মেদ আলী।
১৪৪ ধারা জারির পর ৮টা থেকে শুরু হওয়া কারফিউ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২২ ঘণ্টা বলবৎ ছিলো। এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা এম. রকিবুল হাসান বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই জেলা প্রশাসক কারফিউ জারি করেছেন। ঝুঁকি কেটে গেলে তা প্রত্যাহার করা হবে।
সবার দেশ/কেএম




























