সব কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত
বিলুপ্ত হলো সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, স্বাধীন বিচার বিভাগের স্বপ্নে ধাক্কা
বিচার বিভাগকে প্রশাসনিক ও আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ স্বাধীন করার লক্ষ্যে গঠিত স্বতন্ত্র ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে সরকার। রাষ্ট্রপতির আদেশে মঙ্গলবার (১৯ মে) আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। একইসঙ্গে সচিবালয়ের সিনিয়র সচিবসহ মোট ১৫ জন কর্মকর্তাকে পুনরায় আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরামর্শক্রমেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের প্রেক্ষাপটে এ সিদ্ধান্ত নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জানা গেছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে পৃথক সচিবালয় গঠনের লক্ষ্যে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিলো। কিন্তু বর্তমান সরকার সে অধ্যাদেশকে স্থায়ী আইনে পরিণত না করে উল্টো পুরো সচিবালয় কাঠামোই বিলুপ্ত করে দিলো।
বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির অংশ হিসেবে ‘নির্বাহী বিভাগ হতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ’-এর কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর দীর্ঘ দুই দশকেও এ বিষয়ে কার্যকর কোনও বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
১৯৯৪ সালে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বেতন গ্রেড ও প্রশাসনিক বৈষম্য নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিলে বিচারপতি মাসদার হোসেনসহ ৪৪১ জন বিচারকের পক্ষে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। সে মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষে ১৯৯৭ সালে হাইকোর্ট জুডিশিয়াল সার্ভিসকে স্বতন্ত্র সার্ভিস হিসেবে ঘোষণা করে ঐতিহাসিক রায় দেন।
পরবর্তীতে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ চূড়ান্ত রায়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন। বহুল আলোচিত ‘মাসদার হোসেন মামলা’র সে রায়ে বলা হয়েছিলো, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকবে এবং বিচার বিভাগ কোনওভাবেই নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ হবে না। একইসঙ্গে নিম্ন আদালতের বাজেটও সুপ্রিম কোর্ট নিজেই প্রণয়ন করবে বলে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো।
এর প্রায় আট বছর পর, ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক ঘোষণা করা হয়। তবে বাস্তবে প্রশাসনিক ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ তখনও আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনেই থেকে যায় বলে অভিযোগ ছিলো।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন সৈয়দ রিফাত আহমেদ। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই তিনি বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার প্রশ্নে জোরালো অবস্থান নেন।
গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ইনার গার্ডেনে দেয়া এক অভিভাষণে প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মাসদার হোসেন মামলার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন জরুরি। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, আইন মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে দীর্ঘদিনের ‘দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা’ বিলোপ না হলে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা আসবে না।
এরপর ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর পৃথক সচিবালয় গঠনের একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। একই সময়ে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনও পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে সুপারিশ দেয়। কমিশনের মতে, সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ ও মাসদার হোসেন মামলার আলোকে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক সচিবালয় অপরিহার্য।
সবশেষে গত বছরের ৩০ নভেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়েছিলো। কিন্তু নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সে অধ্যাদেশকে আর আইনে রূপান্তর করা হয়নি। বরং মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে সচিবালয়টিকেই বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলো।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নে নতুন বিতর্ক ও রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিতে পারে।
সবার দেশ/কেএম




























