সমালোচনায় বিএনপি-জামায়াত নেতাদের উপস্থিতি
আ.লীগের ‘লাশের রাজনীতি’ শুরু, মোশাররফের জানাজায় ব্যাপক শোডাউন
জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এ প্রথমবার প্রকাশ্যে এতো বড় জমায়েত ও মিছিল দেখা গেলো দলটির নেতাকর্মীদের। জানাজা শেষে লাশবাহী গাড়িকে ঘিরে স্লোগান, মিছিল ও শোডাউনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
চট্টগ্রামে সাবেক মন্ত্রী ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন-এর জানাজাকে কেন্দ্র করে চিরাচরিত ‘লাশ রাজনীতির’র খাতা খুলে ব্যাপক শোডাউন করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর জঙ্গি অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকাল থেকে নগরীর জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ মাঠ ও আশপাশের এলাকায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এ প্রথমবার প্রকাশ্যে এতো বড় জমায়েত ও মিছিল দেখা গেলো দলটির নেতাকর্মীদের। জানাজা শেষে লাশবাহী গাড়িকে ঘিরে স্লোগান, মিছিল ও শোডাউনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বুধবার রাতে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন-এর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়অয় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে বড় ধরনের শোডাউনের ঘোষণা দেয়া হয়। এর পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম নগরীর জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ মাঠে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজা শেষ হওয়ার আগেই মাঠের বিভিন্ন অংশ থেকে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে’সহ নানা রাজনৈতিক স্লোগান দিতে শুরু করেন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। পরে লাশবাহী গাড়ি মিরসরাইয়ের উদ্দেশে রওনা হলে ওয়াসা মোড় থেকে জিইসি মোড় পর্যন্ত বিশাল মিছিল বের করা হয়।
মিছিলে অংশ নেয়া নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন,
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফকে সরকার হত্যা করেছে। একই সঙ্গে ‘তারেক জিয়া ভোটচোর’, ‘শেখ হাসিনার সরকার বারবার দরকার’—এমন স্লোগানও দিতে দেখা যায় তাদের।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বহু নেতাকর্মী এদিন প্রকাশ্যে অংশ নেন। জানাজার পরিবেশ দ্রুত রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের রূপ নেয়।
এদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় আগে থেকেই বড় জমায়েতের ঘোষণা থাকলেও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিলো বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও বুধবার বিকেলে সিএমপি জানিয়েছিল, জানাজা অনুষ্ঠিত হলেও কোনও ধরনের রাজনৈতিক শোডাউন করতে দেয়া হবে না।
পুলিশের পক্ষ থেকে নন্দনকাননে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের বাসা, জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ মাঠ এবং মিরসরাই পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ ও রায়ট কার মোতায়েনের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিলো। কিন্তু বাস্তবে সকাল থেকেই নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ছিলো ঢিলেঢালা অবস্থা। সে সুযোগে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দলবেঁধে জানাজাস্থলে প্রবেশ করেন এবং পরে প্রকাশ্যে মিছিল বের করেন।
শোডাউনে অংশ নেয়াদের মধ্যে ছিলেন উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান আতা, মিরসরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর ভূঁইয়া, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম, সীতাকুণ্ড উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আরিফুল আলম রাজু এবং উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তানভীর হোসেন চৌধুরী তপু।
এছাড়াও নিষিদ্ধ জঙ্গি ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে সক্রিয় দেখা যায়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, হত্যা ও বিস্ফোরক মামলার একাধিক পলাতক আসামিও শোডাউনে অংশ নেয়। এর মধ্যে মিরসরাইয়ের আলোচিত সন্ত্রাসী আশরাফুল কামাল মিঠু ও নাছির উদ্দিন দিদারের নাম উল্লেখ করা হয়।
তবে এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। পরে সিএমপির জনসংযোগ কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ কমিশনার আমিনুর রশিদ বলেন, জানাজা একটি ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান। সেখানে কে অংশ নেবে, কে নেবে না—তা পুলিশ নির্ধারণ করে না। লাশ নিয়ে মিছিল হয়েছে—এমন কোনও তথ্য পুলিশের কাছে নেই।
অন্যদিকে জানাজায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতার উপস্থিতি নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। জানাজায় অংশ নেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও চসিক মেয়র ডা. শাহাদাৎ হোসেন এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-সমর্থিত চট্টগ্রাম-৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রার্থী ফজলুল হক।
জানাজা শেষে গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে তারা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের রাজনৈতিক অবদান ও চট্টগ্রামের উন্নয়নে তার ভূমিকার প্রশংসা করেন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের অনেকেই তিব্র সমালোচনা করেন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের অন্যতম নীতি নির্ধারক ইঞ্জিনিয়ার মোশারফের জানাযায় অংশ নেয়ার কারণে। আওয়ামীলীগ আমলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, মীর কাশেম আলীর জানাজা করতে না দেয়ার বিষয়টি সামনে আনেন। অনেকে সে সময় জানাজার অনুষ্ঠানে পুলিশি হামলার ছবিও শেয়ার করেন।
এদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন করে ভাইরাল হয়েছে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের পুরোনো কিছু বক্তব্যও। বিশেষ করে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান-কে নিয়ে তার দেয়া একটি বক্তব্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ওই বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন,
জিয়াউর রহমান কোনও দিনও মুক্তিযুদ্ধ করে নাই, সে মুক্তিযুদ্ধের কোন নেতৃত্ব দেন নাই। এটা আমি সাক্ষী আই এ্যাম দ্যা উইটনেস।
চট্টগ্রামে জানাজা শেষে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের লাশ নেয়া হয় তার নিজ এলাকা মিরসরাইয়ের ধুম গ্রামে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে মহাজনহাট স্কুল মাঠে তৃতীয় দফা নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় প্রবীণ এ রাজনীতিককে।
সবার দেশ/কেএম




























