যুদ্ধবিরতিতে রাজি হামাস, তবু থামছে না গণহত্যা
ইসরায়েলি হামলায় জীবন্ত পুড়ে মরলো ১৮ শিশু
গাজার জনপদে যেন পুড়ে যাচ্ছে মানবতা। যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছে ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। অথচ সে সময়ও গাজার স্কুলে চালানো ইসরায়েলি বোমা হামলায় জীবন্ত পুড়ে প্রাণ হারায় ১৮ শিশু। নিহত হয়েছেন অন্তত ৩৬ জন নিরীহ ফিলিস্তিনি।
রোববার রাতভর ইসরাইলি বাহিনীর পৃথক দুটি বিমান হামলায় ৫০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বিবিসি।
সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাটি ঘটে গাজা শহরের আল-দারাজ এলাকার ফাহমি আল-জারজাওয়ি স্কুলে। বেইত লাহিয়া থেকে আসা শত শত বাস্তুচ্যুত মানুষ, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু—সে স্কুলকেই আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু সে নিরাপদ আশ্রয়ই হয়ে ওঠে তাদের ‘জীবন্ত কবর’।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুনে পুড়ে যাওয়া লাশগুলোর মধ্যে অনেকের শরীর এমনভাবে ঝলসে গেছে যে শনাক্ত করাও সম্ভব নয়। কোনো ধরনের সতর্কতা ছাড়াই স্কুলে এ বর্বর হামলা চালানো হয়। স্কুলের শ্রেণিকক্ষ, যেগুলো ঘুমানোর স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো, সম্পূর্ণ ছাই হয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রামি রফিক বিবিসিকে বলেন, আগুনে চারদিক ভস্মীভূত হয়ে যায়। আমার ছেলেটি দগ্ধ দেহ দেখে ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ১১ সেকেন্ডের এক ভিডিওতে দেখা যায়, শরীরে আগুন নিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলো একটি শিশু—শেষ পর্যন্ত পারেনি।
ইসরায়েলি হামলায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন হামাস পুলিশের উত্তর হাজার তদন্ত বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ আল-কাসিহ, তার স্ত্রী ও সন্তানরাও। একই রাতে উত্তর গাজার জাবালিয়াতে একটি পরিবারের বাড়িতে চালানো পৃথক হামলায় আব্দ রাব্বো পরিবারের ১৯ জন সদস্য নিহত হন।
অবিরাম বোমা হামলায় যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে গাজার হাসপাতালগুলোও। ইসরাইলি বাহিনী ঘিরে রেখেছে উত্তর গাজার ইন্দোনেশীয় ও আওদা হাসপাতাল। যে কোনও সময় হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছে সেখানে।
এদিকে, ফিলিস্তিনে চলমান মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে আশার আলো দেখাচ্ছে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা। এক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে হামাস সম্মতি দিয়েছে। এ প্রস্তাবে দুই ধাপে ১০ জন জীবিত ইসরাইলি জিম্মির মুক্তির কথা বলা হয়েছে, বিনিময়ে বহু দীর্ঘ সাজাপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেবে ইসরায়েল।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত এ চুক্তিতে ৭০ দিনের যুদ্ধবিরতি, ইসরায়েলি সেনাদের গাজা থেকে স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার এবং জিম্মি-বন্দি বিনিময়ের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদিও ইসরায়েলি সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি।
এদিকে, গাজার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে খাদ্য ও ওষুধের সংকটে। ইসরায়েল বলছে, ১৯ মে থেকে এখন পর্যন্ত ৩৮৮টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশ করেছে। তবে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিনই প্রয়োজন ৫০০ থেকে ৬০০ ট্রাক।
রোববার মাদ্রিদে ২০টি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইসরায়েল যদি হামলা বন্ধ না করে, তবে তাদের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে ইউরোপীয় দেশগুলো।
চলমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫৩ হাজার ৯৭৭ জন ফিলিস্তিনি। যাদের মধ্যে রয়েছে অন্তত ১৬ হাজার ৫০০ শিশু। আহত হয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজারেরও বেশি মানুষ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামাসের সম্মতির পর যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তা হতে পারে এ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও মানবিক বিপর্যয়ের অবসানের একটি সম্ভাব্য সূচনা। তবে তাতে যদি দমন-পীড়ন না থামে, তবে সেটি কেবল যুদ্ধের নয়, মানবতারও পরাজয় হয়ে থাকবে।
সবার দেশ/কেএম




























