হুঁশিয়ারি তেহরানের
ইরানে হস্তক্ষেপ হলে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি উড়িয়ে দেবেন খামেনি
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালানো হবে—এমন কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে তেহরান। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের হুমকি বাস্তবায়ন করে, তাহলে অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত তেহরান। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেশী দেশগুলোকে আগেই বার্তা দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ওই কর্মকর্তা বলেন, যেসব দেশে মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, তাদেরকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে—ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক বা অন্য কোনও ধরনের হস্তক্ষেপ করলে, ওই দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটি হামলার আওতায় আসবে।
এদিকে তিন মার্কিন কূটনীতিক রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন বিমানঘাঁটি থেকে কিছু কর্মীকে সাময়িকভাবে সরিয়ে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তবে গত বছর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে যে ধরনের বড় পরিসরের সেনা ও কর্মী সরিয়ে নেয়া হয়েছিলো, এবার তেমন কোনও ব্যাপক প্রস্তুতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
কূটনীতিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যার মধ্যে কাতারের আল উদেইদ মার্কিন বিমানঘাঁটি থেকে কিছু কর্মীকে সরে যেতে বলা হয়েছে। তাদের একজন বলেন, এটি বাধ্যতামূলক সরিয়ে নেয়া নয়, বরং কৌশলগতভাবে অবস্থান পরিবর্তনের অংশ। গত বছর ইরান ওই ঘাঁটিতে হামলার আগে আশপাশের স্টেডিয়াম ও শপিং মলে সেনা সরিয়ে নেয়ার দৃশ্য দেখা গেলেও এবার তেমন কোনও তৎপরতা চোখে পড়েনি।
দোহার মার্কিন দূতাবাস এবং কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রকাশ্যে ইরানের বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানিয়ে আসছেন এবং তেহরানের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের হুমকিও দিচ্ছেন। মঙ্গলবার সিবিএস নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি কার্যকর করে, তাহলে ‘খুব শক্ত প্রতিক্রিয়া’ জানানো হবে। একই সঙ্গে তিনি ইরানিদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, ‘সহায়তা আসছে’।
এ বক্তব্যের অর্থ কী—এমন প্রশ্নে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টি সবাই বুঝে নেবে। দমন-পীড়নের জবাবে সামরিক পদক্ষেপসহ নানা বিকল্প বিবেচনায় রয়েছে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ইরানি কর্মকর্তা জানান, উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগও বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে তেহরান তার আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন তারা ওয়াশিংটনকে ইরানে হামলা চালানো থেকে বিরত রাখে।
ইসরায়েলি এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার গভীর রাতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা মন্ত্রিসভাকে ইরানে সরকার পতনের সম্ভাবনা বা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিয়ে ব্রিফ করা হয়েছে। গত বছর ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুক্ত হয়েছিলো।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের অগ্রবর্তী সদর দফতর এবং বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দফতর অবস্থিত।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান আলি লারিজানি কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। একইভাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, আরাগচি আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদকে বলেন, পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ থেকে সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় ইরানিরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত ২,৪০৩ জন বিক্ষোভকারী এবং সরকারপন্থী ১৪৭ জনের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করেছে। অন্যদিকে এক ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, মোট নিহতের সংখ্যা প্রায় ২,০০০ হতে পারে। এইচআরএএনএর হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৮,১৩৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভে উসকানি দেয়ার অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে তুলেছে এবং আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়েছে। তেহরানে একটি কারাগার পরিদর্শনের সময় ইরানের প্রধান বিচারপতি বলেন, সহিংসতায় জড়িতদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা না ঘটে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, বুধবার তেহরানে অস্থিরতায় নিহত একশোর বেশি বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা সদস্যের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
ইরানি কুর্দি মানবাধিকার সংগঠন হেংগাও জানায়, কারাজ শহরে বিক্ষোভ-সংক্রান্ত মামলায় গ্রেফতার ২৬ বছর বয়সী এরফান সোলতানির ফাঁসি বুধবার কার্যকরের কথা ছিলো। তবে ফাঁসি কার্যকর হয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত করা যায়নি। রয়টার্সও স্বাধীনভাবে বিষয়টি যাচাই করতে পারেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, আগের বিক্ষোভগুলো টিকে থাকলেও এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। গত বছরের যুদ্ধের ক্ষত পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই এ অস্থিরতা শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের পর লেবাননের হিজবুল্লাহসহ ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের দুর্বল হয়ে পড়ার প্রভাবও বর্তমান পরিস্থিতিতে ভূমিকা রাখছে।
এর মধ্যেই ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা যেকোনও দেশের পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করা হবে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর মার্কিন নাগরিকদের দ্রুত ইরান ত্যাগ করার আহ্বান জানায়।
সবার দেশ/কেএম




























