দ্য ডেড সোয়ান
সৌন্দর্যের একটা অদ্ভুত নিয়তি আছে। আমরা যত গভীরভাবে দেখতে চাই, কেমন যেনো শেষ হয়ে যাওয়ার আভাস টের পাই।
এটা সত্যি যে, রূপ কখনও একা আসে না—তার সঙ্গে কোথাও একটা নীরব সমাপ্তিও থাকে। ডাচ চিত্রশিল্পী জ্যান ওয়েনিক্সের (১৬৪০-১৭১৯) শিকার-নির্ভর স্টিল লাইফ পেইন্টিং 'দ্য ডেড সোয়ান' যেনো সে দ্বিধার ভাষা—যেখানে সৌন্দর্য ও মৃত্যু অদ্ভুত সমঝোতা তৈরি করে পরস্পরের সমার্থক হয়ে ওঠে।
চিত্রকর্মটি দেখে মনে হয়, সাদা রাজহাঁসটি বিশাল ডানা মেলে শেষ মুহূর্তেও আকাশের দিকে ফিরে যেতে চাইছে। তার শরীরের সাদা রঙ প্রায় অন্ধকার মাটিরঙা পরিবেশের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তিকর সৌন্দর্য তৈরি করেছে—যেখানে রূপ আছে, কিন্তু প্রাণ নেই।
মৃত রাজহাঁসের নিচে পড়ে থাকা ময়ূর, ছোট পাখি, চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ফল—সব মিলিয়ে চিত্রকর্মটি শুধু শিকার হওয়া মৃত প্রাণী নয়, মানুষের ক্ষমতা ও সৌন্দর্যের দ্বন্দ্বকে সামনে আনে। ময়ূরের নীলচে সবুজ রঙ, রাজহাঁসের নির্মল সাদার বৈপরীত্য আমাদের মধ্যে এক ধরনের নান্দনিক অস্থিরতা তৈরি করে। মনে হয়, প্রকৃতির সুন্দর প্রাণগুলোকে নিস্তব্ধতার মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়েছে।
সতেরো শতকে ইউরোপীয় অভিজাত সমাজে শিকার করা প্রাণীদের এমন নির্মম প্রদর্শনকে ক্ষমতা হিসেবেই ধরে নেয়া হতো।
যদিও ওয়েনিক্সের তুলি সে প্রদর্শনকেই এক ধরনের ধ্যানের দৃশ্যে পরিণত করেছে। পালকের সূক্ষ্মতা, ফলের রঙের কোমলতা, পাথরের পাত্রের নকশা, লতানো ফুল—সবকিছু এত নিখুঁতভাবে আঁকা, দেখে মনে হয় শিল্পী যেন তাদের নীরবতাকেও ধরে রাখতে চেয়েছেন।
আর সে নীরবতার মধ্যেই চিত্রকর্মটি গভীর অর্থ খুঁজে পেয়েছে। মৃত্যু এখানে কেবল জীবনাবসান নয়, সৌন্দর্যের নিয়তি সম্পর্কিত ধীর ও বিষণ্ন চিন্তা।
যে সৌন্দর্য একসময় জীবন্ত ছিলো, চিত্রকর্মে তা স্থির। আর সে স্থিরতাকে ওয়েনিক্স নূতন করে স্থায়িত্ব দিয়েছেন। যেমনটা কীটস তার 'Ode on Melancholy' কবিতায় লিখেছিলেন—'She dwells with Beauty—Beauty that must die…'
সৌন্দর্যের বসবাস আমাদের মনেই, তবুও কত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠি আমরা। শিকার আর পাখিদের মৃত্যু জীবনানন্দের কবিতায় বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। এমন মর্মভেদী বোধ নিয়ে জীবনানন্দ লিখেছিলেন—
'নিমীল আগুনে ওই আমার হৃদয়
মৃত এক সারসের মতো।
পৃথিবীর রাজহাঁস নয়—
নিবিড় নক্ষত্র থেকে যেন সমাগত
সন্ধ্যার নদীর জলে এক ভিড় হাঁস ওই— একা;
এখানে পেল না কিছু; করুণ পাখায়...'
লেখক: ব্যাংকার




























