Sobar Desh | সবার দেশ সবার দেশ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০০:১১, ১ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ০০:১২, ১ জুলাই ২০২৬

সংসদে জুয়া প্রতিরোধ আইন পাস

অনলাইন বেটিংয়ে ৭ বছরের জেল, ৫ কোটি টাকা জরিমানা

অনলাইন বেটিংয়ে ৭ বছরের জেল, ৫ কোটি টাকা জরিমানা
ছবি: সংগৃহীত

দেশে প্রযুক্তিনির্ভর জুয়া, অনলাইন বেটিং ও ডিজিটাল আর্থিক প্রতারণা ঠেকাতে নতুন আইন প্রণয়ন করেছে সরকার। জাতীয় সংসদে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে ১৮৬৭ সালের প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো ‘The Public Gambling Act, 1867’ বাতিল করা হয়েছে। নতুন আইনে অনলাইন বেটিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি জুয়া-সংশ্লিষ্ট সব অপরাধকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপস অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি উত্থাপন করেন। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।

এর আগে গত ২৩ জুন বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হলে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বিলটি চূড়ান্তভাবে পাস করা হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৮৬৭ সালের বিদ্যমান আইনটি বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর নয়। সংবিধানের ১৮(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে জুয়া প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০১৮ সালের জেলা প্রশাসক সম্মেলনেও আইনটি যুগোপযোগী করার সুপারিশ করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, বর্তমানে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো, ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক জুয়া, ভুয়া সিম, ভুয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট, বায়োমেট্রিক জালিয়াতি, ভিপিএন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে পরিচালিত জুয়া দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। এসব অপরাধ প্রতিরোধে আধুনিক ও সমন্বিত আইন প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়েছিল।

নতুন আইনে জুয়া-সংক্রান্ত ২৪টি বিষয়ের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জুয়া, অনলাইন জুয়া, দূরবর্তী জুয়া, বেটিং, বাজিকর (বুকমেকার), ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট, মিরর সাইট, ভিপিএনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম।

আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ১৪ ধরনের অপরাধের জন্য পৃথক শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততা, অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়া পরিচালনা, অনলাইন বেটিং, জুয়ার আসর পরিচালনা, জুয়ার সরঞ্জাম প্রস্তুত বা সরবরাহ, বুকমেকার হিসেবে কাজ করা, ম্যাচ ও স্পট ফিক্সিং, জুয়ার বিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং, রেফারেল ক্যাম্পেইন পরিচালনা, ভিপিএন বা মিরর সাইট ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা, ভুয়া সিম ও ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে জুয়া পরিচালনা এবং অর্থপাচার বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার অর্থ লেনদেন।

আইন অনুযায়ী, সাধারণ জুয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা দুই লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।

অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

অনলাইন বেটিং পরিচালনা বা এতে জড়িত থাকলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হবে।

জুয়ার আসর, ভবন, কক্ষ, যানবাহন, সার্ভার বা অবকাঠামো পরিচালনা কিংবা ব্যবহারের দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, চার লাখ টাকা জরিমানা এবং সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা আদালতকে দেওয়া হয়েছে।

জুয়ার সরঞ্জাম প্রস্তুত, সংরক্ষণ, আমদানি, বিক্রি বা বিতরণের দায়ে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আদালত এসব সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত বা ধ্বংসের নির্দেশও দিতে পারবেন।

বুকমেকার হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা জরিমানা এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। আদালত প্রয়োজন হলে দোষী ব্যক্তিকে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে সংশ্লিষ্ট খেলাধুলা বা ক্রীড়া কার্যক্রমে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারবেন।

জুয়ার বিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, মিথ্যা লাভের প্রতিশ্রুতি, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং বা রেফারেল ক্যাম্পেইনে যুক্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী কিংবা খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, হোস্টিং, ডোমেইন সার্ভিস, ক্লাউড অবকাঠামো বা কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হবে।

ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট বা বায়োমেট্রিক জালিয়াতির মাধ্যমে জুয়া পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তবে সংঘবদ্ধভাবে বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে একই অপরাধ করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা করা যাবে।

আইনে আরও বলা হয়েছে, জুয়ার অর্থ ব্যাংক, এমএফএস, ডিজিটাল ওয়ালেট, হাওলা, হুন্ডি কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন বা বৈধ করার চেষ্টা করলে তা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর অধীন সম্পৃক্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

কোনো কোম্পানি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, হোস্টিং সেবা প্রদানকারী বা পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালক, ব্যবস্থাপক, নির্বাহী কর্মকর্তা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকেও দায়ী করা যাবে। আদালত প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত, বাতিল অথবা নিষিদ্ধ করতে পারবেন। একই অপরাধ পুনরায় সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তির দ্বিগুণ পর্যন্ত দণ্ড দেওয়া যাবে।

নতুন আইনে অপরাধে ব্যবহৃত বা অর্জিত অর্থ, ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টো সম্পদ, সার্ভার, ডোমেইন, সিম ও অন্যান্য সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা আদালতকে দেওয়া হয়েছে।

অনলাইন জুয়া ও সাইবারভিত্তিক অপরাধের বিচার হবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে। অন্য অপরাধের বিচার হবে সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি আদালতে। তদন্ত করবেন অন্তত সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তা। প্রয়োজন হলে আদালতের অনুমতি নিয়ে অভিযুক্তের ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট বা ক্রিপ্টো ওয়ালেট সাময়িকভাবে জব্দ বা ফ্রিজ করা যাবে।

এছাড়া সরকার বা সরকার-নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে জুয়া-সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সার্ভার, ডোমেইন, আইপি অ্যাড্রেস, ইউআরএল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ, গ্রুপ, চ্যানেল ও ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম ব্লক, অপসারণ বা নিষিদ্ধ করতে পারবে।

আইনে আরও জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ তৈরি, এনআইডি-সিম-এমএফএস সংযুক্তিকরণ ব্যবস্থা, বায়োমেট্রিক ও ফেসিয়াল রিকগনিশনভিত্তিক যাচাই পদ্ধতি চালু এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

সরকারের আশা, নতুন এ আইন কার্যকর হলে অনলাইন জুয়া, বেটিং, ডিজিটাল আর্থিক প্রতারণা এবং অর্থপাচার রোধে শক্তিশালী আইনি কাঠামো গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় আইনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

সবার দেশ/এফও 

শীর্ষ সংবাদ:

ইকুয়েডরকে উড়িয়ে ৮ বছর পর শেষ ষোলোয় মেক্সিকো
হলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর: কারাগারে ছয় আসামি
পুলিশের তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অবসরে
আইভরি কোস্টকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে নরওয়ে, সঙ্গী পেলো ব্রাজিলকে
জন্মসূত্রে নাগরিকত্বে ট্রাম্পকে আটকালো সুপ্রিম কোর্ট
সংসদে এমপিদের অনুপস্থিতিতে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী, কারণ দর্শানোর নির্দেশ
ইনুর ১০ বছরের সাজা যথেষ্ট নয়: এনসিপি
অনলাইন বেটিংয়ে ৭ বছরের জেল, ৫ কোটি টাকা জরিমানা
এখন কি ওনাকে ঋণখেলাপি বলতে পারবো মাননীয় স্পিকার?-আসলাম চৌধুরীকে প্রসঙ্গে সংসদে জামায়াত এমপির প্রশ্ন
ইনুর রায়ে ক্ষুব্ধ প্রসিকিউশন, অসন্তুষ্ট আসামিপক্ষও
রোমাঞ্চকর টাইব্রেকারে ডাচদের বিদায়, শেষ ষোলোয় মরক্কো
টাইব্রেকারের রুদ্ধশ্বাস নাটকে জার্মানিকে বিদায়, শেষ ষোলোতে প্যারাগুয়ে
বাজেট অধিবেশন শেষে প্রধানমন্ত্রী-বিরোধীদলীয় নেতার কুশল বিনিময়
শেষ মুহূর্তের গোলে জাপানকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে ব্রাজিল
এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব
বিশ্বমানের শিক্ষায় প্রয়োজন উচ্চমানের শিক্ষক ও গবেষণা, ক্যাম্পাস নয়
৩৬ দিনের ‘জুলাই জাগরণ’ কর্মসূচি এনসিপির
সাবেক আওয়ামী এমপির স্ত্রী মৌসুমি কারাগারে