নির্বাচন ও সংস্কার নিয়ে রোডম্যাপের দাবিতে ঐক্যমত
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তিন দলের পৃথক বৈঠক
সামরিক গুঞ্জন, রাজপথে অনিশ্চয়তা ও বিচার সংস্কার ঘিরে উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধ্যায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস পৃথকভাবে বৈঠক করেছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে।
শনিবার (২৪ মে) রাতে যমুনা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকগুলোতে তিনটি দলই আলাদাভাবে নির্বাচন, বিচার ও সংস্কার প্রক্রিয়া ঘিরে তাদের দাবিসমূহ উত্থাপন করে।
বিএনপি: নির্বাচন হোক ডিসেম্বরেই, বিতর্কিত উপদেষ্টাদের বাদ দেয়ার জোর দাবি
বিএনপির একটি শক্তিশালী প্রতিনিধি দল—ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে—বৈঠকে অংশ নেয়। উপস্থিত ছিলেন ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমেদ। দলটি প্রধান উপদেষ্টার কাছে একটি লিখিত প্রস্তাবনা জমা দেয়, যেখানে তারা মূলত তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আলোচনা করে:
- নির্বাচনের সময়সীমা: ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য দ্রুত নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় বিএনপি।
- বিতর্কিত উপদেষ্টাদের অপসারণ: নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও দুইজন ছাত্র সংগঠনের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টার অপসারণ দাবি করে দলটি জানায়, এদের কারণে সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
- আওয়ামী লীগের বিচার: অতীতে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপির নেতাকর্মীদের উপর নিপীড়নের অভিযোগ এনে দলটি বলেছে, তারা বিচার চায়—তবে সেটি স্বাধীন বিচার বিভাগের মাধ্যমেই সম্পন্ন হবে।
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সংস্কার চলবে, কিন্তু নির্বাচন থেমে থাকবে না। আমরা তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে চাই: বিচার, সংস্কার এবং নির্বাচন।
এ সময় তিনি গুজব সম্পর্কে সাফ জানিয়ে দেন, বিএনপি কখনোই প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগ চায়নি। বরং আমরা সরকারকে সহযোগিতা করে এসেছি।
জামায়াতে ইসলামী: নির্বাচন ও সংস্কার নিয়ে সমান্তরাল দুই রোডম্যাপ চাই
জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান বৈঠক শেষে জানান, প্রধান উপদেষ্টাকে আমরা বলেছি, দুটি বিষয়ে পরিষ্কার রোডম্যাপ দরকার—একটি হলো নির্বাচন কখন হবে, দ্বিতীয়টি হলো বিচার ও সংস্কার প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি।
তিনি বলেন, সরকার বলছে নির্দলীয়, কিন্তু বাস্তবে কিছু ব্যত্যয় আছে। উপদেষ্টা পরিষদে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জামায়াত জানায়, তারা মনে করে—যদি আগে সংস্কার না হয়, তাহলে নির্বাচন জনগণের আস্থার জায়গায় পৌঁছাবে না।
তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে প্রধান উপদেষ্টার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তহীনতা ও জাতির উদ্দেশে ভাষণ না দেয়ার বিষয়টিও। বৃহস্পতিবার তিনি জাতিকে বার্তা দিতে চেয়েছিলেন, দেননি—এতে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
এনসিপি: অবৈধ নির্বাচন বাতিল ও গণপরিষদ নির্বাচনের রোডম্যাপ দাবি
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জানান, আমরা নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, শহীদ পরিবার পুনর্বাসন ও গণপরিষদ নির্বাচনের স্পষ্ট সময়সূচি চাই। বিশেষ করে শেখ হাসিনার আমলে হওয়া সব নির্বাচন অবৈধ ঘোষণা করারও দাবি জানিয়েছি।
এনসিপির মূল দাবি:
- বর্তমান ইসি বাতিল ও পুনর্গঠন
- স্থানীয় সরকার ও গণপরিষদ নির্বাচনের নির্দিষ্ট রোডম্যাপ
- জুলাই গণহত্যা ও আন্দোলনকারীদের বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা
তারা বলেন, জনগণের আস্থা ফেরাতে এসব প্রক্রিয়া দ্রুত ও দৃশ্যমানভাবে সম্পন্ন করতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান: সময়সীমা জুন ৩০-এর মধ্যে নির্বাচন নিশ্চিত
তিন দলের আলোচনার পর প্রধান উপদেষ্টা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, ড. ইউনূস কোনও অনিশ্চয়তায় নেই। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, ডিসেম্বর থেকে আগামী জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে—এ সময়সীমার বাইরে কিছুই ঘটবে না।
তিনি বলছেন, সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন—এ তিনটি প্রক্রিয়া সমন্বিতভাবে চলবে। কোনও একটি বাদ দিয়ে অন্যটি এগোবে না।
আজকের বৈঠক: ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা
রোববার (২৫ মে) বিকালে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এবি পার্টি, হেফাজতে ইসলাম, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টিসহ আরও আটটি দলের সঙ্গে বৈঠক করবেন ড. ইউনূস। লক্ষ্য—ধারাবাহিক আলোচনা শেষে একটি সর্বদলীয় ঐকমত্যে পৌঁছানো এবং একটি ‘ট্রানজিশনাল ডেমোক্রেসি রোডম্যাপ’ তৈরি।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সূত্র জানায়, সোমবারের মধ্যে একাধিক বিবৃতি ও ঘোষণায় নির্বাচনের সময়রেখা, উপদেষ্টা পরিষদের গঠন ও বিচারসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে জাতিকে জানানো হবে।
কী বুঝতে পারছি এ বৈঠকগুলোর মধ্য দিয়ে
- বিরোধী দলগুলো নির্বাচনমুখী ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরতে আগ্রহী।
- সব পক্ষ বিচার ও সংস্কারকে একসঙ্গে বিবেচনায় আনতে চাইছে, তবে নির্বাচনের বিলম্ব তারা মানছে না।
- প্রধান উপদেষ্টা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তহীনতা কাটিয়ে এখন সক্রিয় সংলাপের পথ বেছে নিয়েছেন।
- যেকোনো বড় পদক্ষেপ (যেমন পদত্যাগ, সেনা হস্তক্ষেপ বা অর্গানিক ট্রানজিশন) এ বৈঠকগুলোর ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।
সবার দেশ/কেএম




























