বহাল কর্মকর্তাদের ক্ষমতার দাপট
বিটিভিতে দুর্নীতির বিস্ফোরক অভিযোগ, নেই প্রতিকার
বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) দুর্নীতির বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে একাধিক গোয়েন্দা ও তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে। কিন্তু অভিযোগ যতই ভয়ংকর হোক, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এখনো উচ্চপদে বহাল—কেউ বরখাস্ত, এমনকি সাময়িক প্রত্যাহারও হয়নি।
বিভাগীয় তদন্ত ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে শুরু করে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) পর্যন্ত একাধিক পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট দুর্নীতির প্রমাণ মিললেও রহস্যজনক নীরবতায় থেমে রয়েছে সব ব্যবস্থা।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৫ মাস কেটে গেলেও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ভেতর-বাহিরে এখনো দৃশ্যমান দুর্নীতিবাজ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ-ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের অবাধ প্রভাব। অভিযোগ রয়েছে—তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভেতরের একটি শক্তিশালী চক্র সচেষ্টভাবে তদন্ত চেপে যাচ্ছে এবং অভিযুক্তদের রক্ষা করছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি শুধু দুর্নীতির কবলে নয়, জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকেও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে—কারণ এখনও সেখানে পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থার ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালীরা দায়িত্বে।
তদন্ত প্রতিবেদন সচিবালয়ের টেবিলে, সিদ্ধান্তহীনতার অন্ধকারে নথি
দুদক, এনএসআই ও বিটিভির অভ্যন্তরীণ তদন্তের রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে পৌঁছালেও ফাইল স্রেফ ‘লালফিতায়’ আটকে আছে। সচিব বা উপদেষ্টার কাছে নথি পৌঁছানোর আগেই তা থেমে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়ের কোনও এক স্তরে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অপারেশন—যারা প্রত্যেক প্রতিবেদনকে ধামাচাপা দিয়ে রাখছে। বহু প্রমাণ সত্ত্বেও এসব অভিযোগে অভিযুক্তদের কেউ পদ হারাননি, বরং কেউ কেউ আবার পদোন্নতির দৌড়েও রয়েছে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা একাধিকবার যোগাযোগ সত্ত্বেও কোনও মন্তব্য দেননি। এক সপ্তাহের প্রচেষ্টা শেষে তার একান্ত সচিবের মাধ্যমে জানানো হয়—এ বিষয়ে সচিব কোনো বক্তব্য দেবেন না। অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ আলতাফ-উল-আলমের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলে তিনি নিয়মিতই ‘মিটিংয়ে’ থাকার কথা জানান।
তদন্তে উঠে এসেছে যাদের নাম
দুদক ও এনএসআইয়ের প্রতিবেদনে যাদের নাম উঠে এসেছে তাদের ভেতর অন্যতম:
মনিরুল ইসলাম — সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার (চলতি দায়িত্ব)
- বিটিভির সিগন্যাল সিস্টেম ডিজিটালাইজেশনের প্রকল্পে কারচুপি
- ঠিকাদারকে অসমাপ্ত কাজের বিপরীতে বিল পরিশোধ
- দুদকের অনুসন্ধান চলমান থাকা সত্ত্বেও ৬ বছর ধরে দায়িত্বে টিকে থাকা
- রাজনৈতিক পরিচয় পাল্টে ক্ষমতা ধরে রাখার অভিযোগ
মনিরুলের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো তথ্য জানেন না বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং পরে ফোন রিসিভও করেননি।
মোহাম্মাদ সেলিম — নিয়ন্ত্রক, ঢাকা কেন্দ্র
- আলোচিত সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে উল্লেখ
- ভুয়া বিল, অনুমোদনবিহীন খরচ ও অর্থ আত্মসাৎ
- এনএসআইর প্রতিবেদনে দুর্নীতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ
সফির হোসাইন (ইলন) — নির্বাহী প্রযোজক, চট্টগ্রাম কেন্দ্র
- নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা
- সরকারি আদেশ ছাড়াই প্রযোজনা, নিজে উচ্চপদস্থ হিসেবে স্বাক্ষর
- বাজেট অনুমোদনে জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহার
- সাত পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে ‘অত্যন্ত গুরুতর অনিয়মের’ প্রমাণ
বেশ কয়েকবার ফোনকল এবং বার্তা পাঠানো হলেও সফির হোসাইন কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।
বিটিভিতে অদৃশ্য শক্তির দৌরাত্ম্য, শিল্পীরা বলছেন—‘ভয়, ক্ষোভ, হতাশা’
শিল্পী, কর্মী ও কর্মকর্তাদের ভাষ্যে—বিটিভি এখনো দুর্নীতি ও প্রভাবশালী দোসরদের দখলে। প্রশাসনিক অসহযোগিতা ও তদবির-শৃঙ্খলাহীনতার কারণে তদন্ত অগ্রসর হচ্ছে না। চলতি কর্তৃত্বে থাকা কর্মকর্তারা তাদের অবস্থান ব্যবহার করে তদন্তকে নানাভাবে বাধা দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষ। অথচ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের এতবড় দুর্নীতির ছায়া এখনো কাটেনি, বরং গভীর হয়েছে। প্রশ্ন এখন—এত তদন্ত, এতো প্রমাণ, এতো অভিযোগ—তারপরও তারা বহাল কেনো? কে তাদের রক্ষা করছে? রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি থেকেও জরুরি কি তাদের সুরক্ষা?
সমালোচকরা মনে করছেন—বিটিভির আজকের সংকট শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার একটি উদ্বেগজনক প্রতিচ্ছবি।
সবার দেশ/কেএম




























