জট খুলতে নতুন তৎপরতা
থার্ড টার্মিনাল খুলছে কবে? দ্রুত চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল দ্রুত চালুর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তিনি সংশ্লিষ্টদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে টার্মিনালটি যাত্রীসেবার জন্য উন্মুক্ত করার প্রস্তুতি নিতে বলেন।
বৈঠক শেষে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আবারও আলোচনায় বসার নির্দেশ দিয়েছেন। বাংলাদেশের স্বার্থ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত সমাধান খুঁজে বের করতে বলা হয়েছে।
দুই সরকার পেরিয়ে নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সময়েও চালু হয়নি থার্ড টার্মিনাল। প্রায় সাত বছর ধরে নির্মাণকাজ চলার পর অবকাঠামোর ৯৯ শতাংশ কাজ শেষ হলেও পরিচালনা ও চুক্তিগত জটিলতায় এটি এখনো পুরোপুরি চালু করা যায়নি।
জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে মতবিরোধ
টার্মিনাল পরিচালনার জন্য জাপানের চার প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি পিপিপি চুক্তির আলোচনা চলছে। তবে ল্যান্ডিং চার্জ, যাত্রী নিরাপত্তা ফি, বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি থেকে রাজস্ব ভাগাভাগি এবং বাণিজ্যিক স্পেস নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন শর্তে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
কনসোর্টিয়ামের দাবি অনুযায়ী অগ্রিম ৩০০ মিলিয়ন ডলার দেয়ার বিষয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ কারণে চুক্তি স্বাক্ষর আটকে আছে। সরকার বিকল্প হিসেবে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান কিংবা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে।
মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, নকশায় ত্রুটি
টার্মিনালের অভ্যন্তরে মোবাইল নেটওয়ার্ক কভারেজ না থাকায় নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। মূল নকশায় ইনবিল্ডিং নেটওয়ার্ক সলিউশন অন্তর্ভুক্ত না থাকায় এখন সিলিং খুলে নতুন করে অবকাঠামো বসাতে হবে। এতে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়বে।
বেবিচক জানিয়েছে, বিটিআরসি ও মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংক জায়গা ভাড়া নিতে আগ্রহ দেখালেও রাজস্ব ভাগাভাগির প্রস্তাব দেয়নি। টেলিটক একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে।
সালিশি রায়ে বেবিচকের হার
নির্মাণকাজ নিয়ে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও অ্যাভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়ামের বিরোধ আন্তর্জাতিক সালিশি বোর্ডে গড়ায়। তিন সদস্যের বোর্ড বেবিচকের বিরুদ্ধে রায় দেয়। ফলে প্রায় এক হাজার ৬৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হতে পারে।
এ ছাড়া কোরিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্যামসাং অতিরিক্ত কাজের বিপুল অর্থ দাবি করেছে। ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, বোর্ডিং ব্রিজ ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত সিস্টেম আন্তর্জাতিক মানে পুরোপুরি প্রস্তুত কিনা, তা নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম প্রয়োজন।
দুদকের নজর, অর্থায়নে জাইকা
টার্মিনাল নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। এ বিষয়ে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন।
প্রকল্পে সরকারের অর্থায়ন প্রায় ৫ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। বাকি ১৬ হাজার ১৪১ কোটি টাকার বেশি ঋণ দিয়েছে জাইকা। টার্মিনাল চালু হলে বার্ষিক যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা ৮ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ২৪ মিলিয়নে উন্নীত হবে। কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতাও দ্বিগুণ হবে।
বিকল্প পরিকল্পনার নির্দেশ
বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। বিদেশি অপারেটর না পাওয়া গেলে বেবিচকের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ পরিকল্পনাও করতে হবে।
মন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, এখনই নির্দিষ্ট সময় বলা সম্ভব নয়। তবে দ্রুত সমাধানের জন্য আলোচনা, তদন্ত ও প্রযুক্তিগত যাচাই একসঙ্গে চলছে।
সব মিলিয়ে থার্ড টার্মিনাল এখন একদিকে অবকাঠামোগত সাফল্যের প্রতীক, অন্যদিকে চুক্তি, ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার জটিল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর এবার দেখার বিষয়—কত দ্রুত যাত্রীদের জন্য খুলছে বহু প্রতীক্ষিত এ টার্মিনাল।
সবার দেশ/কেএম




























