Remit–Return–Rebuild: প্রবাসী থেকে উদ্যোক্তা—বাংলাদেশ কি প্রস্তুত?
বিদেশে অর্জিত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে দেশে শিল্পায়ন ও স্ব-কর্মসংস্থানে রূপান্তরের নীতিগত কাঠামো
[ধারাবাহিক ফিচারের পর্ব–০১–এ ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জনের সামগ্রিক ভিশন ও রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছিলো। পর্ব–০২–এ আলোচনা করা হয় দক্ষ কর্মী প্রেরণ, জিরো মাইগ্রেশন কস্ট এবং রাষ্ট্রীয় রিভলভিং ফান্ডের মাধ্যমে সে লক্ষ্য অর্জনের নীতিগত ভিত্তি নিয়ে। এ পর্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—বিদেশফেরত প্রবাসীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলে কীভাবে Remit–Return–Rebuild মডেলকে বাস্তবে রূপ দেয়া যায়।]
বাংলাদেশের উন্নয়ন আলোচনায় প্রবাসীরা দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন। তবে এ ভূমিকা প্রায় সবসময়ই সীমাবদ্ধ থেকেছে রেমিট্যান্স পাঠানোর মধ্যে। আমরা প্রবাসী কর্মীদের দেখেছি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস হিসেবে, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই তাদের দেখা হয়েছে ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তা কিংবা শিল্পায়নের অংশীদার হিসেবে। অথচ বিদেশে ১৫–২০ বছর কাজ করে ফিরে আসা একজন প্রবাসী শুধু অর্থ নয়—সঙ্গে করে নিয়ে আসেন দক্ষতা, কাজের শৃঙ্খলা, প্রযুক্তি ব্যবহার, মান নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস এবং আন্তর্জাতিক বাজার বোঝার বাস্তব অভিজ্ঞতা। Remit–Return–Rebuild দর্শন এ জায়গাতেই একটি মৌলিক পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয়।
বিদেশে কাজ করা প্রবাসীরা সময়ের মূল্য বোঝেন, উৎপাদনের গুণগত মান রক্ষা করেন এবং গ্রাহকের প্রত্যাশা সম্পর্কে সচেতন থাকেন। এ গুণগুলো একজন উদ্যোক্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশে ফিরে অধিকাংশ প্রবাসী এ সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে পারেন না। সঠিক দিকনির্দেশনা, গবেষণাভিত্তিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে তারা অনেক সময় অনিরাপদ খাতে বিনিয়োগ করেন—যেমন জমি, ফ্ল্যাট বা স্বল্পমেয়াদি ব্যবসা—যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। ফলে সম্ভাবনাময় একটি মানবসম্পদ ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
কেন প্রত্যাগত প্রবাসীরা উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উপযোগী?
স্বদেশ প্রত্যাগত প্রবাসীরা উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি স্বতন্ত্র সুবিধা নিয়ে আসেন। প্রথমত, তাদের হাতে সাধারণত কিছু সঞ্চিত পুঁজি থাকে। দ্বিতীয়ত, তারা ঝুঁকি নিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকেন, কারণ বিদেশে কাজ করাই এক ধরনের বড় ঝুঁকির সিদ্ধান্ত। তৃতীয়ত, তারা আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশে কাজ করে মান, দক্ষতা ও উৎপাদন ব্যবস্থার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এ তিনটি উপাদান—পুঁজি, মানসিক প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতা—একজন উদ্যোক্তার মৌলিক ভিত্তি। কিন্তু এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা অপরিহার্য। শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগের ওপর ছেড়ে দিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ সম্ভাবনা পূর্ণতা পায় না।
কোন খাতে প্রবাসী উদ্যোক্তারা সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন?
বাংলাদেশের বাস্তবতা ও বাজার কাঠামো বিবেচনায় কয়েকটি খাত বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়। এর মধ্যে প্রথমেই আসে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্প। আধুনিক কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ডেইরি, ফিশারিজ, অর্গানিক পণ্য ও হালাল ফুড—এ খাতে দেশে যেমন চাহিদা রয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারেও বড় সম্ভাবনা আছে। বিদেশফেরত প্রবাসীরা এখানে প্রযুক্তি ব্যবহার ও মান নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেন।
আরও পড়ুন <<>> দক্ষ কর্মী প্রেরণ ও জিরো মাইগ্রেশন কস্ট: ১০০ বিলিয়ন রেমিট্যান্সের চাবিকাঠি
দ্বিতীয়ত, কুটির ও হস্তশিল্প। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প পণ্য যদি আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী নকশা, প্যাকেজিং ও মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উপস্থাপন করা যায়, তাহলে এটি একটি বড় রফতানি খাতে পরিণত হতে পারে। তৃতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME)—যেমন লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, প্যাকেজিং, রিসাইক্লিং, কৃষি-সহায়ক যন্ত্রপাতি ও লজিস্টিক সাপোর্ট সার্ভিস। এছাড়া বাংলাদেশ উপযোগী কিন্তু বিদেশে রফতানিযোগ্য পণ্য ও সেবা—আইটি এনাবলড সার্ভিস, ব্যাক-অফিস সাপোর্ট, কেয়ার সার্ভিস—এসব খাতেও প্রবাসী উদ্যোক্তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
গবেষণাভিত্তিক ব্যবসায়িক মডেল কেনো জরুরি?
প্রবাসীদের উদ্যোক্তা বানাতে হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রিসার্চ-বেজড বিজনেস মডেল। ‘ব্যবসা করুন’ বলা যত সহজ, বাস্তবে তা সফল করা তত কঠিন। কোন এলাকায় কোন পণ্য বা সেবা টেকসই, কাঁচামাল কোথা থেকে আসবে, উৎপাদন খরচ কত, বাজার কোথায়, লাভের মার্জিন কত—এ প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া উদ্যোক্তা হওয়া মানেই ঝুঁকি বাড়ানো। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের যৌথ উদ্যোগে রিটার্নি উদ্যোক্তা ইনকিউবেশন সেন্টার বা ল্যাব গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রবাসীরা প্রস্তুত ব্যবসায়িক মডেল, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ পেলে ব্যর্থতার হার অনেক কমে আসবে।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা একা নয়: এন্ট্রাপ্রাইজ লিংকেজের প্রয়োজন
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো বাজারে প্রবেশ। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পক্ষে একা দেশি বা আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য বা সেবা বিক্রি করা অত্যন্ত কঠিন। তাই প্রয়োজন এন্ট্রাপ্রাইজ লিংকেজ মডেল। এ মডেলে বড় কোনও করপোরেট বা রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্য সংগ্রহ, মান নিয়ন্ত্রণ, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনের দায়িত্ব নেবে। এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উৎপাদনে মনোযোগ দিতে পারবেন, আর বড় প্রতিষ্ঠান নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত সরবরাহ পাবে। কৃষিভিত্তিক শিল্প, কুটির শিল্প কিংবা এমএসএমই-সব ক্ষেত্রেই এ মডেল কার্যকর হতে পারে। এটি দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের উপস্থিতি বাড়াতে সহায়ক হবে।
রাষ্ট্রের ভূমিকা: ফ্যাসিলিটেটর, মালিক নয়
এ পুরো Remit–Return–Rebuild প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের ভূমিকা হওয়া উচিত ফ্যাসিলিটেটরের। রাষ্ট্র সরাসরি ব্যবসা করবে না, কিন্তু নীতিগত সহায়তা, অর্থায়ন কাঠামো, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও বাজার সংযোগ নিশ্চিত করবে। প্রবাসী কল্যাণ তহবিল, এসএমই ফাউন্ডেশন, ব্যাংক ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ রূপান্তর সম্ভব নয়। একটি সমন্বিত নীতিমালার মাধ্যমে যদি ফেরত প্রবাসীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা শুরু করতে পারবেন।
উপসংহার
বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে রেমিট্যান্স-নির্ভর অর্থনীতি থেকে রেমিট্যান্স-চালিত উদ্যোক্তা অর্থনীতিতে রূপান্তর ঘটাতে চায়, তবে Remit–Return–Rebuild মডেলই হতে পারে সবচেয়ে বাস্তব ও টেকসই পথ। প্রবাসী কর্মীকে কেবল বৈদেশিক মুদ্রার উৎস হিসেবে না দেখে, তাকে উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে পারলেই দেশের শিল্পায়ন, রফতানি সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এ রূপান্তর ঘটাতে পারাই হবে বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী বড় ধাপ।
লেখক
শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান কর্মী
ড্যাফোডিল গ্রুপ সিইও।




























