অসম চুক্তির পূনর্মূল্যানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পর্যালোচনা
শান্তি চুক্তির ২৮তম বর্ষপূর্তিতে চুক্তির প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
আধুনিক রাষ্ট্রে বৈষম্যযুক্ত ও অশান্তির পার্বত্য চুক্তিকে পুনর্গঠন নতুবা বাতিল করা সময়ে দাবিমাত্র বলে মন্তব্য করেছেন ‘পাঠশালা সিএইচটি রিসার্চ সেল’র পরিচালনা সদস্য- ওমর ফারুক।
বাংলাদেশের এক-দশমাংশ জুড়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম। এখানে তিনটি জেলা ও ২৬ টি উপজেলা নিয়ে এ অঞ্চল। ১৯৯৭ সালের তথাকথিত ‘শান্তি চুক্তি’ আসলে একটি অসম, ত্রুটিপূর্ণ ও অসাংবিধানিক রাজনৈতিক আপস, যা একটি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর চাপের কাছে রাষ্ট্রকে কুক্ষিত করেছে। এ চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত লক্ষ লক্ষ বাঙালিকে নিজ দেশেই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানানো হয়েছে।
আজ প্রশ্ন রাখতে চাই—
- একটি একক ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশে কীভাবে একটি অঞ্চলকে ‘উপজাতীয় অধ্যুষিত’ ঘোষণা করে বাকি ৬১ জেলা থেকে আলাদা করা হয়?
- কীভাবে একটি অনির্বাচিত আঞ্চলিক পরিষদ বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ভোগ করে?
- কীভাবে একজন সার্কেল চীফ নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার ও ভূমির মালিকানা নির্ধারণ করে?
এ সবই রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ও সাংবিধানিক আত্মসমর্পণের নগ্ন উদাহরণ।
চুক্তির পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে জেএসএস, ইউপিডিএফ, কেএনএফসহ বিভিন্ন সশস্ত্র ও অনিবন্ধিত সংগঠন বাঙালিদের উপর প্রকাশ্য সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপর অতর্কিত হামলা,অপপ্রচার, গুম, হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ—এ সব অপরাধ দিনের আলোতেই ঘটছে। অথচ রাষ্ট্রের নীরবতা ও কিছু তথাকথিত মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থান এ সন্ত্রাসকে আরও উৎসাহিত করছে।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো—এ সন্ত্রাসের শিকার বাঙালিরা কোনো সময় চেয়েছে শান্তি-শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতির মেলবন্ধন। কিছু দেশি-বিদেশি বিতর্কিত সুশীলরা উপজাতিদের ‘পশ্চাদপদ’ তকমা লাগিয়ে আন্তর্জাতিক তহবিল, এনজিও প্রকল্প ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা কুক্ষিগত করা হচ্ছে। বাস্তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা, প্রশাসন, ব্যবসা, ভূমি ও ক্ষমতার প্রায় সব জায়গা আজ একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৩ টি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস।
আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই—
- পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বহু ধারা বাংলাদেশ সংবিধানের ওপর সরাসরি আঘাত।
- এটি বাংলাদেশ সংবিধানের ধারাসমূহ ১, ২৭, ২৮, ৩৬, ৫৯, ৮০ ও ১২২ অনুচ্ছেদের প্রকাশ্য লঙ্ঘন।
- এ চুক্তি একটি জনগোষ্ঠীকে অতিরাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিয়েছে এবং আরেকটি জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে কোণঠাসা করেছে।
- এটি শান্তি চুক্তি নয়—এটি বৈষম্যের দলিল, বিভাজনের দলিল এবং ভবিষ্যৎ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সংঘাতের নীলনকশা।
আমরা সরকারকে স্পষ্ট করে আরও বলতে চাই—
- সংবিধানের ঊর্ধ্বে কোনো চুক্তি নেই।
- সন্ত্রাসের সঙ্গে কোনো আপস নেই।
- এবং মূলধারা বাঙালিদের অধিকার বিসর্জন দিয়ে পাহাড়ে কখনও শান্তি আসবে না।
আমাদের দাবি পরিষ্কার—
- পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সকল অসাংবিধানিক ও বৈষম্যমূলক ধারা অবিলম্বে পুনর্গঠন বা বাতিল করতে হবে।
- অনির্বাচিত আঞ্চলিক পরিষদ ও তার অবৈধ ক্ষমতার অবসান ঘটাতে হবে।
- পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল নাগরিকের জন্য সমান ভূমি, ভোট ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
- সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র ছাড় না দিয়ে কঠোর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
- বসবাসরত সকল জাতিগোষ্ঠী ও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্যে প্রত্যাহাকৃত ২৪৬ টি সেনাক্যাম্প পুনরায় স্থাপন করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম কোনও আলাদা রাষ্ট্র নয়, কোনও পরীক্ষাগার নয়, কোনও গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তিও নয়। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষার্থে সাতজন বীরশ্রেষ্ঠদের মধ্যে অন্যতম একজন বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ শহিদ হয়েছেন এবং তার সমাধি রয়েছে রাঙ্গামাটি নানিয়াচরে। এটি বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এবং এখানকার প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার নিয়ে বাঁচতে চায়—ভিক্ষা নয়, ন্যায্য অধিকার।
খাগড়াছড়ি, পার্বত্য জেলা




























