নিস্তব্ধ এভারকেয়ার
অশ্রুসিক্ত বিদায়ে ‘আপসহীন’ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতাল আজ যেন শোকের নিঃশব্দ এক অধ্যায়। বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় এ হাসপাতালেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই হাসপাতাল প্রাঙ্গণে জড়ো হতে থাকেন দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। প্রিয় নেত্রীকে হারানোর বেদনায় সবার চোখেমুখে ছিল গভীর শোক আর শূন্যতা।
মঙ্গলবার দুপুরে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব সদস্যদের কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অন্য রোগীদের যাতায়াতে বিঘ্ন না ঘটে—সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্দিষ্ট দূরত্বে নেতাকর্মীদের অবস্থান নিশ্চিত করছে। সকালের দিকে শোকাহত মানুষের ভিড় বেশি থাকলেও দুপুরের পর তা কিছুটা কমে আসে। তবে শোকের ভার যেন কমেনি কারও চোখে-মুখে।
আগামীকাল বুধবার সকাল ১১টার দিকে বেগম খালেদা জিয়ার মরদেহ জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে নেওয়া হবে—এ তথ্য জানা সত্ত্বেও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন হাসপাতালের সামনে। বিশেষ করে প্রবীণ নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মতো। অশ্রুসিক্ত চোখে সবাই প্রার্থনা করছেন তাদের ‘আপসহীন’ নেত্রীর আত্মার মাগফিরাত কামনায়।
ঢাকার পার্শ্ববর্তী রূপগঞ্জ থেকে আসা বিএনপি সমর্থক সৈয়দ মোহাম্মদ আলী বলেন, খালেদা জিয়া আমাদের আপসহীন নেত্রী, গণতন্ত্রের মা। রাজনীতির এক সংকটময় সময়ে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আল্লাহ তাকে জান্নাত নসিব করুন। বাংলাদেশের জন্য তাকে আরও অনেকদিন প্রয়োজন ছিলো।
বাড্ডার বেরাইদের মোড়লপাড়া থেকে আসা মোহাম্মদ নাসির বলেন, সকালে নেত্রীর ইন্তেকালের খবর শুনেই ছুটে এসেছি। মনটা খুব ভারাক্রান্ত। দীর্ঘদিন তিনি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন, কারাবরণ করেছেন। অথচ যখন সব দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্ত হলেন, তখনই না ফেরার দেশে চলে গেলেন। তার জন্য অন্তর থেকে দোয়া করি।
গত ২৩ নভেম্বর থেকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন খালেদা জিয়া। চিকিৎসকরা বারবার জানিয়েছিলেন, তার অবস্থা অত্যন্ত জটিল এবং তিনি সংকটময় সময় পার করছেন।
১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপির ওয়েবসাইট অনুযায়ী তার জন্মস্থান জলপাইগুড়ি বলেও উল্লেখ রয়েছে। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদার। তাদের আদি বাড়ি ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে হলেও তারা স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন দিনাজপুর শহরের মুদিপাড়া এলাকায়।
দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন তিনি। ১৯৬০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিবাহ হয়। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালে ফার্স্ট লেডি হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক পরিসরে বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান ও বিশ্বনেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন।

১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর বিএনপির সংকটময় সময়ে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন তিনি।
আশির দশকে সামরিক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে খালেদা জিয়া হয়ে ওঠেন আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক। স্বৈরাচার পতনের আগ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ঘোষণাসহ সাত দলীয় জোট গঠনের মাধ্যমে তিনি আন্দোলনকে সংগঠিত করেন। এ সময়ে তাকে সাতবার গ্রেফতার ও গৃহবন্দী করা হয়।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তার শাসনামলেই সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষা খাতে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করেন তিনি। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করার সিদ্ধান্তও আসে তার হাত ধরে।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় যেতে না পারলেও ১১৬ আসন নিয়ে তিনি সংসদের প্রধান বিরোধী দলীয় নেত্রী হন। ১৯৯৯ সালে চারদলীয় জোট গঠন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে আবারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় ২৯তম স্থানে স্থান দেয়।
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে কোনও আসনে পরাজিত না হওয়ার বিরল রেকর্ড রয়েছে তার। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত যেসব আসনে তিনি নির্বাচন করেছেন, সবগুলোতেই বিজয়ী হয়েছেন। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেট সিনেট গণতন্ত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে ‘গণতন্ত্রের যোদ্ধা’ উপাধিতে ভূষিত করে।
২০১৮ সালে একটি মিথ্যা মামলায় তাকে কারাদণ্ড দেয়া হয়। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলাটি ছিলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পর্যায়ক্রমে সব মামলায় তিনি খালাস পান।
আজ সে আপসহীন নেত্রী চিরবিদায় নিয়েছেন। নিস্তব্ধ এভারকেয়ার হাসপাতাল আর অশ্রুসিক্ত মানুষের ভিড় যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে—বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের অবসান হলো।
সবার দেশ/কেএম




























