হাসিনা যুগের অবসান: আল জাজিরাকে হাসিনাপুত্র জয়
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলের অবসান কি স্থায়ী রূপ নিতে যাচ্ছে—এ প্রশ্নে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের মন্তব্য। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জয় ইঙ্গিত দিয়েছেন, আওয়ামী লীগ যদি ভবিষ্যতে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পায়, শেখ হাসিনাকে আর দলীয় নেতৃত্বে নাও দেখা যেতে পারে।
আল জাজিরাকে জয় বলেন, তার মা শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চান এবং রাজনীতি থেকে অবসর নিতে আগ্রহী। আমার মা আসলে দেশে ফিরতে চান। তিনি অবসর নিতে চান। তিনি বিদেশে থাকতে চান না,—সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলেন জয়।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতা হারানোর পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী থাকা এ নেত্রী বর্তমানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত হয়েছেন। একই সঙ্গে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় দলটি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বড় একটি অংশ দেশের বাইরে আত্মগোপনে রয়েছেন। যারা দেশে ছিলেন, তাদের অনেকেই গ্রেফতার হয়ে কারাবন্দি।
আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে জয়ের বাসায় গিয়ে এই সাক্ষাৎকারটি নেন। জয় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।
সাক্ষাৎকারে জৈন জানতে চান, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কোনো ভবিষ্যৎ আদৌ আছে কি না। জবাবে জয় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলেন, আওয়ামী লীগ কোথাও যাচ্ছে না। তার ভাষায়, এটি দেশের সবচেয়ে পুরনো ও বড় রাজনৈতিক দল, যার সমর্থন এখনো বিপুল।
জয় বলেন, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে। আপনি কি মনে করেন, ৪০–৫০ শতাংশ মানুষ হঠাৎ করে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করে দেবে? দেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ৬–৭ কোটি ভোটার আওয়ামী লীগের। তারা কি একদিনে হারিয়ে যাবে?—প্রশ্ন রাখেন তিনি।
এ সময় সাংবাদিক আবারও জয়ের আগের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে আনেন, যেখানে তিনি বলেছিলেন শেখ হাসিনা রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ার কথা ভাবছেন। জৈনের প্রশ্ন ছিলো, শেখ হাসিনা যদি দেশে ফেরেন, তাহলে কি তিনি আর সক্রিয় রাজনীতিতে থাকবেন না।
জবাবে জয় বলেন, না। তার বয়স হয়েছে—৭৮ বছর। এমনিতেই এটা তার শেষ মেয়াদ হওয়ার কথা ছিলো। তিনি অবসর নিতে চাচ্ছেন।
এ পর্যায়ে আল জাজিরার সাংবাদিক সরাসরি প্রশ্ন করেন, এটিকে কি ‘হাসিনা যুগের সমাপ্তি’ বলা যায়? উত্তরে জয় বলেন, সম্ভবত তাই।

এরপর আবার প্রশ্ন আসে—আওয়ামী লীগ যদি রাজনীতিতে ফেরে, তাহলে কি শেখ হাসিনাকে ছাড়াই সে প্রত্যাবর্তন হবে? জয়ের উত্তর ছিল স্পষ্ট: হ্যাঁ। আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল। ৭০ বছর ধরে আছে। তাকে নিয়ে বা তাকে ছাড়াই দল চলবে। কেউ তো চিরদিন বাঁচে না।
সাক্ষাৎকারে উঠে আসে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও নির্বাচনের প্রসঙ্গও। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচন নানা অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। সে সময় জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ ছিলো, আর এখন আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ—এ বাস্তবতাকে ‘নিয়তির পরিহাস’ হিসেবে তুলে ধরেন আল জাজিরার সাংবাদিক।
শ্রীনিবাসন জৈন প্রশ্ন করেন, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিষয়টি মানবাধিকার সংস্থাগুলো বরাবরই সমালোচনা করে এসেছে—এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির কি কোনো মিল নেই?
জবাবে জয় বলেন, আওয়ামী লীগ কখনও কাউকে নিষিদ্ধ করেনি। জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছিলো আদালতের রায়ের মাধ্যমে। আওয়ামী লীগের সময়ের নির্বাচনগুলোতে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি ২০১৮ সালের আগে করা বিভিন্ন জনমত জরিপের কথা তুলে ধরেন।
জয়ের দাবি, দেশি-বিদেশি জরিপেই দেখা যাচ্ছিলো আওয়ামী লীগ বিপুল ব্যবধানে জয়ী হবে। তার ভাষায়, প্রশাসনের ভেতরের কিছু ব্যক্তি নিজেরাই অনিয়ম করেছে, দলীয়ভাবে এর প্রয়োজন ছিলো না। তিনি বলেন, তার মা এবং তিনি নিজেরাও এসব ঘটনায় ক্ষুব্ধ ছিলেন।
২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়েও জয় দাবি করেন, সেখানে কোনও কারচুপি হয়নি। বিরোধী দলগুলোর নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তকে তিনি ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে উল্লেখ করেন।
সাক্ষাৎকারে সহিংসতার সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এর আগে জয় বলেছিলেন, আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে কোনও নির্বাচন ‘হতে দেয়া হবে না’ এবং দমন–পীড়ন চললে পরিস্থিতি সহিংসতার দিকে যেতে পারে। এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সরকার আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার যুক্তি দেখাচ্ছে—এ কথা তুলে ধরেন আল জাজিরার সাংবাদিক।
জবাবে জয় বলেন, তিনি সহিংসতার হুমকি দেননি। তার মতে, কাউকে সম্পূর্ণ কোণঠাসা করে ফেললে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াই সহিংসতা। তবে তিনি কখনো তার কর্মীদের হামলা করতে বলেননি বলে দাবি করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের কর্মীদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ তুলে জয় বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর শত শত নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন এবং বহু মানুষ হেফাজতে মারা গেছেন। তিনি সাম্প্রতিক সময়ে এক সংখ্যালঘু আওয়ামী লীগ নেতার কারাগারে মৃত্যুর কথাও উল্লেখ করেন।
ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগ জড়িত কি না—এ প্রশ্নে জয় তা সরাসরি অস্বীকার করেন। তার দাবি, আওয়ামী লীগের এমন কোনও সক্ষমতা থাকলে বর্তমান সরকার টিকে থাকতো না।
হাদির হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—পুলিশের এমন বক্তব্যের বিষয়ে জয় বলেন, ছাত্রলীগে একসময় অসংখ্য তরুণ যুক্ত ছিলো। কার কতটা ভূমিকা ছিলো, সেটি না যাচাই করে পুরো দায় আওয়ামী লীগের ওপর চাপানো হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারের শেষভাগে জয় বলেন, আওয়ামী লীগ এখন সহিংসতার পথে নেই। বরং তাদের বর্তমান কৌশল হলো এ নির্বাচনকে অবৈধ হিসেবে তুলে ধরা এবং মানুষকে ভোট না দেয়ার আহ্বান জানানো।
আল জাজিরার এ সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ, আওয়ামী লীগের টিকে থাকা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ‘হাসিনা যুগ’ সত্যিই শেষ কি না—তার উত্তর আপাতত ভবিষ্যতের হাতেই থাকছে।
সবার দেশ / কেএম




























