তিন প্রকার বিচারক: কারা জান্নাতে, কারা জাহান্নামে?
নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত দুটি মামলার শুনানি নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশের বিচার ব্যবস্থা। বাদী পক্ষের দুজনই সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে পুরো জাতিকে জানিয়ে দিয়েছেন আদালতের ভেতরের বাস্তবতা। তারা শুধু আদালতের বিচারেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং জনতার আদালতেও এ বিচার ব্যবস্থাকে তুলেছেন।
প্রথম মামলা ছিলো এক নারীর ধর্ষণ মামলা। অভিযোগ রয়েছে, বিবাদী প্রভাবশালী হওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিচারক বাদীকে চাপ দিচ্ছেন মামলা আপস করার জন্য। এর ফলে বাদী ন্যায়বিচার পাওয়ার পরিবর্তে উল্টো মানসিক চাপে পড়েছেন।
দ্বিতীয় মামলাটি আরও চাঞ্চল্যকর। এখানে বিবাদী একজন নিয়মিত বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। বাদী আরেক কর্মকর্তার স্ত্রী। এটিও একটি ধর্ষণ মামলা। কিন্তু এ মামলায় বিচারক বাদিনীর প্রতি অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করে মামলা রিজেক্ট করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
এসব ঘটনার পর সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছে—মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এ ধরনের আচরণ কি ইসলাম সমর্থন করে? বিচারকেরাও কি এভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন?
পবিত্র কোরআনে ন্যায়বিচারের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন,
নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফ, সদাচার ও আত্মীয়দের দান করার আদেশ দেন এবং তিনি আশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। (সূরা নাহল, আয়াত-৯০)
আবার অন্যত্র বলা হয়েছে,
হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক এবং আল্লাহর সাক্ষী হও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়। কেউ ধনী বা দরিদ্র হলে তার প্রতি পক্ষপাত করো না। আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক। সুতরাং তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, যাতে তোমরা অবিচার করো। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলো অথবা সত্যকে এড়িয়ে যাও, তবে জেনে রাখো, তোমরা যা করো আল্লাহ তার খবর রাখেন। (সূরা আন-নিসা, আয়াত ১৩৫)
হাদিস শরিফেও বিচারকদের দায়িত্ব ও পরিণতি স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। হযরত বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
বিচারক তিন প্রকার: এক প্রকার জান্নাতে যাবে, আর দুই প্রকার জাহান্নামে যাবে। যে বিচারক সত্যকে জেনে তদনুযায়ী বিচার করে, সে জান্নাতে যাবে। যে বিচারক সত্যকে জেনেও অবিচার করে, সে জাহান্নামে যাবে। আর যে বিচারক সত্য না জেনে বিচার করে, সেও জাহান্নামে যাবে। (তিরমিযী, সুনানে আবু দাউদ, বুলুগুল মারাম, হাদিস নং ১৪০১)।
অর্থাৎ, সত্য উপলব্ধি করে ন্যায় বিচারকারীই জান্নাতের অধিকারী হবেন। কিন্তু সত্য জেনেও অন্যায় করা কিংবা অজ্ঞতা ও অবহেলায় বিচার করা—দুটোই পরিণত হবে জাহান্নামে।
তবে এটাও সত্য, বিচারকরাও মানুষ। তারা রাগ, অনুরাগ বা বিরাগ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন। কিন্তু আইনের শপথ নেয়া একজন বিচারকের দায়িত্ব হলো ন্যায়কে প্রাধান্য দেয়া, আবেগকে নয়।
পরিশেষে বলা যায়, দেশের বিচারকরা যদি কোরআন-হাদিসের এ নির্দেশনা অন্তরে ধারণ করে দায়িত্ব পালন করেন, তবে বাদী-বিবাদী উভয়েই সুবিচার পাবেন এবং সমাজে আস্থা ফিরে আসবে।
লেখক:
এম এম এ শাহজাহান, প্রকৌশলী
মার্কেটিং অ্যাডভাইজার, ফাইন গ্রুপ।




























