ফেরা আর হলো না অভিনয়ে, চিরনিদ্রায় শামস সুমন
বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ শামস সুমন আর নেই। অভিনয়ে ফেরার ইচ্ছা থাকলেও তা আর পূরণ হলো না—হাজারো ভক্ত ও সহকর্মীকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে তিনি চিরবিদায় নিয়েছেন।
৬১ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। পরদিন সকালে রাজধানীর চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় তার প্রথম জানাজা। সেখানে উপস্থিত হয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বহু পরিচিত মুখ, সহকর্মী ও ভক্তরা।
পরে তার লাশ নিজ শহর রাজশাহী-তে নেয়া হয়। নগরের ঝাউতলা এলাকায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে বৃহস্পতিবার বাদ এশা হেতেম খাঁ কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। শেষবারের মতো প্রিয় অভিনেতাকে দেখতে সেখানে ভিড় করেন অসংখ্য মানুষ।
সহকর্মীদের কণ্ঠে স্মৃতিচারণ
অভিনেতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন সহকর্মীরা। জাহিদ হাসান আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, হঠাৎ মৃত্যুসংবাদে তিনি পুরো রাত ঘুমাতে পারেননি। তার ভাষায়, ওর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিলো অসাধারণ। মানুষ এত ভালো হয়—ওকে দেখে তা বুঝতাম।
নির্মাতা সালাহউদ্দিন লাভলু বলেন, শামস সুমন সবার প্রিয় ছিলেন। ছোট-বড় সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া সহজ নয়, কিন্তু তিনি তা পেরেছিলেন। তার চলে যাওয়া মেনে নেয়া কঠিন।

পরিবারের অপেক্ষা শেষে দাফন
শামস সুমনের বড় ছেলে লন্ডনে পড়াশোনা করায় পরিবারের সদস্যদের দেশে ফেরার জন্য কিছু সময় অপেক্ষা করা হয়। পরে তারা দেশে পৌঁছালে দাফনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এতে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও ভক্তদের উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মতো।
শৈশব, শিক্ষা ও শিল্পীজীবন
রাজশাহীতেই জন্ম অভিনেতা সুমনের। বেড়ে ওঠাও রাজশাহীতে। ১৯৮২ সালে তিনি বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে রাজশাহীর গভ. ল্যাবরেটরি হাইস্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেন। মেধাতালিকায় রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডে পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। এরপর ১৯৮৪ সালে বাণিজ্য বিভাগ থেকেই উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন রাজশাহী কলেজ থেকে। পরে তিনি মার্কেটিং বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।

শৈশবে বাংলাদেশ বেতার-এ অভিনয় ও আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে সুনাম কুড়ান। রাজশাহী আবৃত্তি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবেও যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে ঢাকায় এসে মঞ্চনাটক দিয়ে অভিনয়জীবন শুরু করে ছোটপর্দা ও চলচ্চিত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
চলচ্চিত্র ও স্বীকৃতি
‘মন জানে না মনের ঠিকানা’, ‘কক্সবাজারে কাকাতুয়া’, ‘চোখের দেখা’, ‘প্রিয়া তুমি সুখী হও’, ‘আয়না কাহিনী’, ‘বিদ্রোহী পদ্মা’, ‘জয়যাত্রা’সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নেন তিনি।
২০০৮ সালে ‘স্বপ্নপূরণ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন এ অভিনেতা।
ফিরতে চেয়েও আর ফেরা হলো না
ক্যারিয়ারের একপর্যায়ে আলোচনার বাইরে চলে গেলেও আবার অভিনয়ে ফিরতে চেয়েছিলেন শামস সুমন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, মধ্যবয়সী শিল্পীদের চাহিদা কমে যাওয়ায় কাজের সুযোগ কমে গেছে। তবুও তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন নতুন করে ফিরে আসার।
কিন্তু সে প্রত্যাবর্তন আর হলো না। প্রিয় এ অভিনেতা এখন শুধুই স্মৃতি—তার অভিনয়, কণ্ঠ ও ব্যক্তিত্বে তিনি বেঁচে থাকবেন ভক্তদের হৃদয়ে।
সবার দেশ/কেএম




























