দুঃসাহসী আত্মত্যাগ ইতিহাস হয়ে থাকবে
মানবিকতা ও সাহসের দুই নক্ষত্র মাহেরীন-মাসুকা
উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় জীবন উৎসর্গকারী দুই শিক্ষক—মাহেরীন চৌধুরী ও মাসুকা বেগম—আজ আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাদের গল্প কোটি মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে। তাদের জীবন, সম্পর্ক, দায়বদ্ধতা, মূল্যবোধ—সবকিছু মিলে তারা হয়ে উঠেছেন এক অনন্য উদাহরণ। নিছক পেশাদারিত্ব নয়, সত্যিকারের মানুষ হিসেবে কেমন হওয়া উচিত, সেটাই যেন নিজের প্রাণ দিয়ে শিখিয়ে গেলেন তারা।
মাহেরীন চৌধুরী: শিক্ষকতাই ছিলো তার জীবন, মাতৃত্ব ছিলো সকলের জন্য
মাহেরীন চৌধুরী ছিলেন মাইলস্টোন স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির সমন্বয়ক। স্কুলের সঙ্গে তার সম্পর্ক দীর্ঘ ১৭ বছরের—সহকারী শিক্ষক হিসেবে যাত্রা শুরু করে ধাপে ধাপে পৌঁছান নেতৃত্বের জায়গায়। শিক্ষার্থীরা তাকে ডাকত ‘ম্যাম’, কিন্তু সম্পর্ক ছিল অনেক বেশি গভীর। তিনি ছিলেন বন্ধু, আশ্রয়, আদর্শ। শুধু ক্লাসরুমে পাঠদান নয়, শিশুদের মানসিক ও নৈতিক গঠনে তার ভূমিকা ছিলো মায়ের মতো।
তার দুই সন্তান রয়েছে—বয়সে ছোট। কিন্তু মাহেরীন যেন মাইলস্টোনের প্রতিটি শিশুকেই নিজের সন্তান জেনে ভালোবেসেছেন। সোমবার বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর মুহূর্তে চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায় ধোঁয়ায়, আগুনের লেলিহান শিখায় ভরে যায় কক্ষ। সবাই যখন পালাতে ব্যস্ত, তখন তিনি আগুন পেরিয়ে একে একে শিশুগুলোকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। নিজের সন্তানদের কথা মনে পড়েনি? পড়েছে নিশ্চয়ই, কিন্তু বলেছিলেন—‘ওরাও তো আমার সন্তান।’
মৃত্যুর আগে বার্ন ইনস্টিটিউটে স্বামীর সঙ্গে শেষবার দেখা হয়। স্বামী মনসুর হেলালের কাছে তার শেষ কথা ছিল—‘তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে না।’ তখনও তার শরীর আগুনে ক্ষতবিক্ষত, কিন্তু আত্মা দৃঢ়। এমন বিদায় বোধ হয় কেবল সে মানুষই নিতে পারেন, যার হৃদয়ে থাকে বিশুদ্ধ ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ।
মাসুকা বেগম: অবিবাহিত জীবন, উৎসর্গিত এক ভালোবাসার গল্প
মাসুকা বেগমের জীবন আরও এক অনন্য অধ্যায়। তিনি কোনোদিন বিয়ে করেননি। স্কুলই ছিলো তার ঠিকানা, শিক্ষার্থীরাই ছিলো তার পরিবার। মা-বাবার দেখভাল, ভাইবোনের পাশে থাকা—সবকিছু করেছেন নীরবে, কারও কাছে অভিযোগ না করে। তার জীবনযাপনের চেয়ে গভীর ছিলো তার দায়বোধ।
তিনি ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে শ্রেণিকক্ষে ছিলেন যখন বিমানটি আছড়ে পড়ে। শিশুরা ভয় পেয়ে কাঁপছে—তিনি তাদের শান্ত করেন, বলেন, তোমরা ভয় পেয়ো না। আমি আছি। তিনি ছিলেন সত্যিই। আগুনের মুখে দাঁড়িয়ে একে একে শিশুদের বের করে আনেন। এরপর নিজে আর বের হতে পারেননি।
তার ৮৫ শতাংশ শরীর দগ্ধ হয়। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, তার কণ্ঠনালি পর্যন্ত পুড়ে গেছে। ঘণ্টা কয়েকের ব্যবধানে নিভে যায় সে মমতাময় জীবনের আলো। মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছায় তার পরিবারে, যারা তখনও আশাবাদী ছিলেন হয়তো তিনি ফিরবেন। কিন্তু ফিরেছেন না ফেরার দেশে।
দুই নারীর এক আত্মত্যাগের গল্প
দুই নারীর গল্প আলাদা হলেও আত্মত্যাগের বোধ এক। একজন মা ছিলেন নিজের ও অন্যদের সন্তানের; আরেকজন হয়ে উঠেছিলেন মা না হয়েও অসংখ্য সন্তানের অভিভাবক। তারা দেখিয়ে গেছেন, শিক্ষকতা পেশা নয়—এটা একটি সেবা, একটি অঙ্গীকার।
তাদের বিয়োগে আমরা শুধু দুইজন শিক্ষক হারাইনি—আমরা হারিয়েছি মনুষ্যত্বের উজ্জ্বল উদাহরণ। তারা বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে, পাঠ্যবইয়ের পাতায়, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অনুপ্রেরণায়।
রাষ্ট্র ইতোমধ্যে তাদের ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে ঘোষণা করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এ ঘোষণার বাইরে তাদের যে সম্মান প্রাপ্য—তা আমরা দিতে পারবো তখনই, যখন আমাদের সমাজে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং জাতীয় চরিত্রে তাদের মতো মানুষ আরও সৃষ্টি হবে।
এ দুই আত্মত্যাগী শিক্ষক জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়ে চলে গেছেন। কিন্তু রেখে গেছেন এক প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই প্রস্তুত এমন আত্মত্যাগের মর্যাদা দিতে? যদি হই, তাহলে তাদের স্মৃতিকে শুধু অশ্রু নয়, হোক তা ভবিষ্যৎ গড়ার অঙ্গীকার।
সবার দেশ/কেএম




























