বিপু–তারানা হালিমের সংশ্লিষ্টতা তদন্তে
সোনিয়া বশিরের প্রতারণায় স্টার্টআপ খাতে ভূমিকম্প
বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত বড় ধরনের সংকটে পড়েছে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান এসবিকে টেক ভেঞ্চারস লিমিটেড এবং এর প্রধান নির্বাহী সোনিয়া বশির কবিরের কার্যক্রমের কারণে। বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, অর্থ ফেরত না দেয়া, মিথ্যা প্রচারণা ও হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচারের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পিবিআই–এর তদন্ত চলছে, যা ইতোমধ্যে আদালতে জমা দেয়া হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, সাবেক সরকারের কাছ থেকে স্টার্টআপ উন্নয়ন তহবিল পাওয়ার পরও এসবিকে টেক ভেঞ্চারস কোনো প্রকল্পে যথাযথ অর্থ ছাড় দেয়নি। এর ফলে মার্কোপোলো, ফসল, যাত্রী, টেন মিনিট স্কুল, অরোগ্য ও সলশেয়ার–এর মতো সম্ভাবনাময় স্টার্টআপগুলো মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়ে। উদ্যোক্তারা বলছেন, বিনিয়োগের আশ্বাস পেয়ে তারা ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রস্তুতি নিলেও শেষ পর্যন্ত কোনও অর্থ পাননি।
গত বছর এসবিকে দাবি করেছিলো, তারা ৭১ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছে, কিন্তু উদ্যোক্তারা একে নিছক প্রচারণা বলে উড়িয়ে দেন।
এরই মধ্যে পিবিআই তদন্তে নতুন তথ্য উঠে এসেছে— প্রতিষ্ঠানটির গুলশান অফিসটি অবস্থিত সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের মালিকানাধীন ভবনে। এছাড়া সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু–এর সঙ্গেও প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ও ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, কিছু লেনদেন হুন্ডির মাধ্যমে হয়েছে কি না, এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থার একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ‘সোনিয়া–বিপু–তারানা সংযোগ’ এখন নজরদারিতে রয়েছে। জানা গেছে, সোনিয়া বশির ছাড়া বাকি দুজন বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। একটি সূত্র দাবি করেছে, সোনিয়া বশিরের পক্ষ থেকে তারানা হালিমের কাছে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে নসরুল হামিদ বিপুর যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি ও ব্যবসা থাকার তথ্যও তদন্তে এসেছে।
স্টার্টআপ উদ্যোক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মার্কোপোলো’র প্রতিষ্ঠাতা তাসফিয়া তাসবিন বলেন, মনে হয়েছে তিনি স্টার্টআপগুলোকে ধ্বংস করার পরিকল্পনাই করেছিলেন। ফসলের প্রতিষ্ঠাতা সাকিব বলেন, তার আচরণ শুধু উদ্যোক্তাদের ক্ষতিই করেনি, বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
সোনিয়া বশিরের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলমান। বিনিয়োগকারী জেরিন চৌধুরীর দায়ের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি তিন দফায় ১ কোটি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ নেন, যা লভ্যাংশসহ এখন দাঁড়িয়েছে দুই কোটি নয় লাখ টাকারও বেশি। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনি অর্থ ফেরত দেননি, বরং অতিরিক্ত ৮৫ লাখ টাকা ব্যক্তিগত ঋণ হিসেবে নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন।
পিবিআইয়ের তদন্তে ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ই-মেইল ও চুক্তিপত্রের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, এ ঘটনায় দণ্ডবিধির ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ) ও ৪২০ (প্রতারণা) ধারায় অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে।
এসবিকে টেক ভেঞ্চারসের বিরুদ্ধে আরও দুটি বড় অভিযোগ রয়েছে—
- এক প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তার কাছ থেকে ১৫ কোটি টাকা,
- এবং ফাইবার হোম লিমিটেডের কাছ থেকে ১২ কোটি টাকা গ্রহণ করে ফেরত না দেয়ার।
এসব ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দেশি ও বিদেশি আদালতে একাধিক মামলা চলছে।
বাংলাদেশের স্টার্টআপ অঙ্গনের পরিচিত মুখ সোনিয়া বশির কবির এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা বলছেন, পুঁজি হারানো ক্ষতি, কিন্তু বিশ্বাস হারানো ধ্বংস। তারা এখন সরকারের কাছে খাতটিতে কড়া নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা নিশ্চয়তার দাবি তুলেছেন।
গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করলে সোনিয়া বশির প্রতিবেদনের প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান। তিনি নিজেকে দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিয়ে দাবি করেন, তার কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিএনপির এক তরুণ নেতা, যিনি ভবিষ্যতে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।
সবার দেশ/কেএম




























