শেষ হলো ওঝা লাল চাঁনের জীবনযুদ্ধ
‘ওঝার মৃত্যু সাপের কামড়ে, দায় কার?’
সাপ ধরতে গিয়ে সাপের কামড়েই শেষ হলো প্রায় চার দশকের অভিজ্ঞ সাপুড়ে লাল চাঁনের জীবন। বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার নাচনাপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা এ প্রবীণ ওঝার মৃত্যু এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নামিয়েছে।
সাপ ধরতে গিয়ে প্রাণ হারালেন লাল চাঁন
ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার (১০ জুন) সকালে। স্থানীয় ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আনিসুর রহমান জুয়েলের বাড়িতে সাপের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে ডাকা হয় লাল চাঁনকে। পেশাদার সাপুড়ে হিসেবে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে কাজ করা লাল চাঁন যথারীতি সাপ ধরতে যান। কিন্তু প্রতিপক্ষ সাপটি এবার আর দয়া করেনি। সাপ ধরার চেষ্টাকালে হঠাৎই কামড়ে বসে বিষধর প্রাণীটি।
তাৎক্ষণিকভাবে লাল চাঁনকে পাথরঘাটা থেকে মঠবাড়িয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। সেখান থেকে অবস্থা গুরুতর হওয়ায় বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। রাত ১০টার দিকে হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
চার দশকের পেশাগত জীবন শেষ এক দংশনে
৬৫ বছর বয়সী লাল চাঁন ছিলেন মৃত যোগেন্দ্র কর্মকারের সন্তান। বাঁশতলা গ্রামের মানুষ তাকে ‘ওঝা’ হিসেবে চিনতেন। জীবনের চার দশক কাটিয়েছেন সাপ ধরা, ঝাড়ফুঁক এবং গ্রামীণ চিকিৎসা দিয়ে। স্থানীয়রা জানান, বহুবার সাপের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি, কিন্তু কখনও এতটা ভয়াবহ পরিণতি হয়নি। অনেকে বিশ্বাস করতেন, ‘ওঝা লাল চাঁনের ঝাড়ে সাপও নরম হয়ে যায়।’ কিন্তু শেষবার সে সাপই আর বশে আসেনি।
স্থানীয়দের কণ্ঠে শোক ও প্রশ্ন
স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য গোলাম ছরোয়ার রুমি (বাচ্চু মেম্বার) জানান, উনি একজন অভিজ্ঞ সাপুড়ে ছিলেন। সবাই তাকে ডেকে সাপ ধরাতো। কিন্তু এবার ভাগ্য তাকে রক্ষা করেনি।
ঘটনার পর এলাকাজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে—এখনও কেন প্রতিকূল পরিবেশে জীবন ঝুঁকি নিয়ে সাপ ধরতে হয় ওঝাদের? সঠিক প্রতিরোধ ও চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় কেন মৃত্যুর ঝুঁকি নিতে হয় এমন অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের?
পেশাগত ঝুঁকি ও সমাজের উদাসীনতা
লাল চাঁনের মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত একটি পেশার প্রতি সমাজ ও রাষ্ট্রের উদাসীনতার প্রতিচ্ছবি। এখনও অনেক গ্রামীণ এলাকায় সাপ ধরার জন্য ডাক পড়ে এমন সাপুড়েদের। অথচ তাদের নেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, সুরক্ষা সরঞ্জাম কিংবা তাৎক্ষণিক প্রতিষেধক ব্যবস্থা। লাল চাঁনের মৃত্যু সই চরম বাস্তবতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো।
এ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হলো এক প্রবীণ ওঝার জীবন, কিন্তু থেকে গেল সমাজের এক অনুত্তর প্রশ্ন—‘ওঝার মৃত্যু সাপের কামড়ে, দায় কার?’
সবার দেশ/কেএম




























