বিচারহীনতার সামনে হার মানলো এক শহীদের বাবার বিশ্বাস
পতাকা নামলো শহীদ আনাসের কবর থেকে
একটা রাষ্ট্র যখন ন্যায়বিচার দিতে পারে না, তখন সবচেয়ে আগে ভেঙে পড়ে আদালত না—ভেঙে পড়ে মানুষের ভরসা। আর সে ভরসা যখন মরে যায়, তখন তার কবরেও পতাকা টেকে না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া শহীদ আনাসের বাবা আবেগঘন ভাষায় বলেন, যে বাংলাদেশকে ভালোবেসে আনাস শহীদ হয়েছে, সে ভালোবাসার প্রতীক হিসেবেই কবরটিকে পতাকার রূপ দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু বিচার না থাকলে সে প্রতীক ধরে রাখার নৈতিক শক্তিও নাকি আর অবশিষ্ট নেই।
শহীদ আনাসের বাবার এ পোস্ট এখন নীরব কিন্তু নির্মম এক রাজনৈতিক দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে তিনি লিখেছেন—ছেলের কবর থেকে বাংলাদেশের পতাকা সরিয়ে ফেলেছেন। শুধু তাই নয়, কবরের চারপাশের গাছও নিজেই তুলে ফেলেছেন।
কারণ?
যে দেশের জন্য ছেলে মরলো, সে দেশে নাকি বিচার নেই।
এটা কোনও সাধারণ আবেগী স্ট্যাটাস না—এটা রাষ্ট্রের প্রতি এক নাগরিকের শেষ নোটিশ।
রাষ্ট্র যদি হত্যাকারীদের বিচার করতে না পারে, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতীক বহন করার নৈতিক দায়ও কি নাগরিকের থাকে?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘শহীদ’ শব্দটা বহুবার ব্যবহার হয়েছে—মঞ্চে, মিছিলে, পোস্টারে, নির্বাচনী ভাষণে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, শহীদের রক্ত দিয়ে রাজনীতি হয়, বিচার হয় না—এমন অভিযোগ এখন আর শুধু বিরোধী রাজনীতির ভাষা না, ভুক্তভোগী পরিবারের মুখেও উঠে আসছে।
আরও পড়ুন <<>> হাদির শাহাদাত দিবসকে ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব দিবস’ ঘোষণার প্রস্তাব
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটা শুধু একটি পরিবারের ক্ষোভ নয়; এটা বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জমে থাকা বিস্ফোরক হতাশার প্রতিচ্ছবি। কারণ, বিচারহীনতা কখনোও নিরপেক্ষ থাকে না—আজ এক পরিবারের দরজায় আসে, কাল আরেক পরিবারের।

সবচেয়ে নির্মম অংশটা হয়তো পোস্টের শেষ প্রার্থনায়—
একজন বাবা বলছেন, বিচার চাইতে তিনি আর রাষ্ট্রের কাছে যান না, সরাসরি আল্লাহর কাছে যান।
এই জায়গাটাই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ, যখন নাগরিক রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারায়, তখন রাষ্ট্রের শক্তি থাকে শুধু কাগজে—মানুষের মনে নয়।
প্রশ্ন এখন খুব সহজ—
বাংলাদেশ কি এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে, যেখানে শহীদ তৈরি করা সহজ, কিন্তু শহীদের বিচার করা কঠিন?
আর যদি এমনই হয়, তাহলে ভবিষ্যতের ইতিহাসে হয়তো লেখা থাকবে—
এ দেশে একসময় মানুষ শুধু জীবনে না, মৃত্যুতেও রাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরাপত্তা পেতো না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘শহীদ’, ‘বিচার’ এবং ‘রাষ্ট্রের দায়’—এ তিন শব্দ বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন একজন বাবা সন্তানের কবরে পতাকা রাখতে পারেন না, তখন প্রশ্নটা আবার নতুন করে ফিরে আসে—
রাষ্ট্র কি শুধুই স্মৃতিস্তম্ভ বানাতে জানে, নাকি ন্যায়বিচারও দিতে পারে?
৩০ জানুয়ারি ২০২৬
সম্পাদক




























