ইলিশ শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও হোক জাতীয় মাছ
জাতীয় প্রতীক শুধু শোভামাত্র নয়; তা দেশের মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা, জাতীয় ফল কাঁঠাল, জাতীয় পাখি দোয়েল কিংবা জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার—এসবের মধ্যে কোনও না কোনোভাবে আমাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা আছে। এগুলো আমরা দেখি, জানি, অনুভব করি। কিন্তু জাতীয় মাছ ইলিশের ক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্ন।
কাগজে-কলমে ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ হলেও এটি আজ আর সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নেই। বরং ইলিশ হয়ে উঠেছে তথাকথিত এলিট শ্রেণির ভোজ্য সামগ্রী। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে, সার্বজনীনতার স্পর্শহীন একটি মাছ কীভাবে জাতীয় মর্যাদা ধরে রাখতে পারে?
অন্তর্বর্তী সরকারের সদ্য নেয়া সময়োপযোগী পদক্ষেপ আমাদের এ প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারে। সম্প্রতি সরকার ইলিশের দাম নির্ধারণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশের অন্যতম বড় ইলিশ উৎপাদন এলাকা চাঁদপুরসহ সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে এ দাম নির্ধারণের বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের ভাষ্য, ইলিশের ব্যাপক সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও অস্বাভাবিক দামের কারণে সাধারণ মানুষ এ মাছ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকার সে বঞ্চনা দূর করতে উদ্যোগ নিয়েছে, যা নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পাওয়ার মতো।
ইলিশের সামাজিক অবস্থান
ইলিশ শুধু মাছ নয়, বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং আবেগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পদ্মা-মেঘনার ইলিশ নিয়ে দেশের ভেতর যেমন গর্ব, তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এর কদর অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্বব্যাপী 'Hilsa of Bangladesh' এখন পরিচিত ব্র্যান্ড। কিন্তু যে দেশের নদ-নদী থেকে এ মাছ আহরিত হয়, সে দেশের সাধারণ মানুষ যদি নিজেদের জাতীয় মাছের স্বাদ নিতে না পারে, তবে তা শুধু দুঃখজনক নয়, জাতির জন্য লজ্জারও।
বর্তমানে বাজারের বাস্তবতা হলো, সাগর বা নদীতে উৎপাদনের খরচ না থাকার পরও ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ব্যবসায়ী, মধ্যস্বত্বভোগী এবং সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে ইলিশের দাম সবসময়ই উর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে ইলিশ মৌসুমে যখন জালে প্রচুর মাছ ধরা পড়ে, তখনও বাজারে এর মূল্য কমে না, বরং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম আরও বাড়ানো হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্ন আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তাদের জন্য ইলিশ শুধু গল্পের মাছ, টেলিভিশনের খবর বা অন্যের খাবার টেবিলে দেখা যায়; নিজের প্লেটে নয়।
সরকারের সদ্য নেয়া পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা
সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ইলিশের দাম নির্ধারণের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা বাস্তবতা বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী। কারণ বাজারে সরবরাহ বাড়লেও সিন্ডিকেটের কারণে ভোক্তা পর্যায়ে দাম কমছে না। মধ্যস্বত্বভোগীরা মুনাফার আশায় বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এর ফলে মাছের প্রকৃত মূল্য বহুগুণ বেড়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসকের বক্তব্য ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় স্পষ্ট, সরকার ইলিশের বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর হতে যাচ্ছে। মাছ আহরণ, মজুদ ও বিক্রয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট মূল্যসীমা নির্ধারণ করে দিলে ভোক্তা পর্যায়ে এর সুফল পাওয়া যাবে। এ উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নই পারে ইলিশকে জাতীয় মাছের মর্যাদায় সত্যিকারের সার্বজনীন অবস্থানে নিয়ে যেতে।
মূল্য নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
ইলিশের দাম নির্ধারণ অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, উৎপাদনকারী পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খলে অসংখ্য মধ্যস্বত্বভোগী জড়িত। এদের একাংশ কোনও ধরনের সরকার নির্ধারিত দামকে অগ্রাহ্য করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক কিংবা প্রভাবশালী ছত্রচ্ছায়ায় থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যনীতি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
তাই শুধু কাগজে-কলমে দাম নির্ধারণ করলেই চলবে না, নিশ্চিত করতে হবে কঠোর বাজার তদারকি, মনিটরিং ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। ইলিশের উৎপাদন ও বিপণন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। নদীতে ইলিশ আহরণের পরপরই বাজারে সরাসরি বিক্রির ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। আড়ত ও পাইকারি পর্যায়ে সিন্ডিকেট ভাঙতে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মৎস্য বিভাগের আওতায় আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে দাম নিয়ন্ত্রণ আরও সহজ হবে।
সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা
ইলিশের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে পারলে শুধু খাদ্য হিসেবে নয়, দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবেও ইলিশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য ইলিশের স্বাদ গ্রহণ শুধু আর্থিক ব্যাপার নয়; এটি আত্মমর্যাদারও বিষয়। তারা জাতীয় মাছের স্বাদ নিতে পারলে নিজেকে রাষ্ট্রের অংশ বলে মনে করতে পারবেন। অন্যথায়, জাতীয় মাছের মর্যাদা নিয়ে শুধু বক্তৃতা-সেমিনার করে লাভ নেই।
সরকারের সদ্য নেয়া পদক্ষেপ সফল হলে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও মাছের বাজারে গিয়ে নির্দিষ্ট মূল্যে ইলিশ কিনতে পারবেন। শহরের অভিজাত রেস্তোরাঁ কিংবা ধনী পরিবারের ডাইনিং টেবিল থেকে বেরিয়ে ইলিশ পৌঁছাবে সাধারণ মানুষের ঘরে-ঘরে। তাহলেই কেবল ইলিশের জাতীয় মর্যাদা বাস্তবতা পাবে।
ইলিশ শুধু ধনীদের মাছ হয়ে থাকলে, কেবল প্রচারণা, বক্তৃতা আর জাতীয় পরিচিতির শিরোনাম হয়ে থাকলে সেটি জাতীয় মাছের মর্যাদা ধরে রাখতে পারবে না। ইলিশের প্রকৃত জাতীয় অবস্থান তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন দেশের প্রত্যেক নাগরিক, শ্রেণি-পেশা-অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে, এ মাছের স্বাদ নিতে পারবে। অন্তর্বর্তী সরকারের মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ তাই শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার বড় পদক্ষেপ।
আমরা আশা করি, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে কোনো ধরনের ছাড় বা আপস করা হবে না। কঠোর তদারকি, আইন প্রয়োগ ও দুর্নীতি-সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধেও সরকার কঠিন অবস্থান নেবে। তাহলে সত্যিকার অর্থে ইলিশ কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও হয়ে উঠবে আমাদের জাতীয় মাছ।
৪ জুলাই ২০২৫
সম্পাদক




























