দলীয় কর্মীদের রাজনৈতিক অপরাধের দায় কার?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অদ্ভুত ধারা প্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে—দলীয় কর্মী প্রতিপক্ষের মার খেলে দল ঐ কর্মীর দায়িত্ব নিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার সর্বশক্তি নিয়োগ করে, আর কর্মী যদি প্রতিপক্ষের কাউকে ক্ষতিগ্রস্থ করে এবং সেটা নিয়ে যদি দেশব্যাপী প্রতিবাদ হয়, তবে সে কর্মী দলের কেউ নয়!
এ হীনমন্যতা ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতি ক্রমেই আমাদের রাজনীতিকে বিবেকহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন করে তুলছে। অতিসম্প্রতি চট্টগ্রামে বাম ছাত্র সংগঠনের এক শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিলে ছাত্রশিবিরের সশস্ত্র হামলার অভিযোগ সামনে আসার পর এ প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে: রাজনৈতিক কর্মীর অপরাধের দায় আসলে কে নেবে?
চট্টগ্রামের ঘটনাটির ভিডিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। ভিডিওতে দেখা যায়, বাম ছাত্রসংগঠনের একজন নারী কর্মীকে নির্মমভাবে লাথি মারছে এক যুবক। নির্যাতিত কর্মীটি মাটিতে পড়ে যান, তবুও থামেনি হামলা। পরে জানা যায়, হামলাকারীর নাম আকাশ চৌধুরী, যিনি ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। নেটিজেনরা তার পুরনো ছবি, পোস্ট, এমনকি শিবিরের মিছিলে তার উপস্থিতির ছবি পর্যন্ত তুলে ধরেন। প্রাথমিক প্রমাণ যাই বলুক না কেনো, জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির উভয়েই তাৎক্ষণিকভাবে দায় এড়িয়ে বলেন—আকাশ চৌধুরী আর আমাদের কেউ নন, সে এখন আমাদের কর্মী নয়, একসময় ছিলো।
প্রশ্ন হচ্ছে, আকাশ যদি আর ছাত্রশিবিরের কর্মী না হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি শিবিরের মিছিলে কীভাবে অংশ নিলেন? তার নেতৃত্বে মিছিল করার সুযোগ কে দিলো? একক কোনও ব্যক্তি তো দলীয় ব্যানার ও স্লোগান নিয়ে রাস্তায় নামতে পারেন না। তার উপস্থিতি মিছিলের অংশ হিসেবেই প্রমাণ করে, সংগঠন তার সক্রিয় সদস্য না হলেও মিছিলের অংশ করার মাধ্যমে তাকে সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত বলেই বিবেচনা করেছে। এবং যদি সংগঠন এ বিষয়ে উদাসীন হয়—তাহলে আরও ভয়ংকর বার্তা ছড়ায়: আপনি আমাদের প্রাক্তন হলেও, আমাদের মিছিলে এসে অপরাধ করলে আমরাই দায় এড়িয়ে যাবো।
এটি প্রথম কোনো উদাহরণ নয়
এর বিপরীত উদাহরণ আমরা দেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল নেতা সাম্যকে ঘিরে সাম্প্রতিক আন্দোলনে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকসেবীদের হাতে নিহত হন সাম্য। এ ঘটনায় ছাত্রদল ও বিএনপি সংগঠিত প্রতিক্রিয়া জানায়, শাহবাগ অবরোধ করে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোগান্তি সৃষ্টি করে। সরকারের ‘ব্যর্থতা’, ভিসির পদত্যাগ, মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা—এসব তুলে ধরার মাধ্যমে দল হিসেবে বিএনপি সাম্যর জীবনের দায় ও তার প্রতি নৈতিক দলগত দায়িত্ব স্বীকার করে নেয়।
অঅরও পড়ুন <<>> এক জয়ের হারের গল্প: ‘জনতার মেয়র’ থেকে ‘ক্ষমতার মেয়র’
কিন্তু যদি ঘটনার রূপ উল্টো হতো? অর্থাৎ, সাম্য যদি কোনো নিরীহ ছাত্রকে মারধর করতেন কিংবা মাদকসেবীদের সঙ্গে জড়িত থাকতেন, তখন কি ছাত্রদল বা বিএনপি একইভাবে দায় নিতো? বাস্তবতা বলে—না। বরং বলা হতো, সে হয়তো একসময় ছাত্রদল করতো, কিন্তু এখন আর দলের সঙ্গে নেই। দলের আদর্শ এভাবে কাউকে মারধর করার অনুমোদন দেয় না। আমরা দায় নিতে পারি না।
এই 'দায় স্বীকার' বনাম 'দায় অস্বীকার' – এ দ্বিচারিতা আমাদের রাজনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। দল যদি কর্মীর মৃত্যুতে পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিতে পারে, তাহলে কর্মীর অন্যায় আচরণেও দলের দায় থাকা উচিত। এটি নৈতিকতার প্রশ্ন, ন্যায্যতার প্রশ্ন এবং রাজনীতির মৌলিক জবাবদিহির প্রশ্ন।
আরও গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, এ দায় এড়ানোর সংস্কৃতি বিশেষ করে দেখা যায় প্রগতিশীল, মধ্যমপন্থা, ডান-বাম এমনকি ইসলামী দলগুলোতেও। জামায়াতে ইসলামী, যারা নিজেদের নৈতিক রাজনীতির ধারক ও বাহক হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়, তারাও আজ এ 'মৌখিক অস্পষ্টতা' ও 'সুবিধাবাদী অস্বীকার' নীতিকে সবচেয়ে ভালোভাবেই চর্চা করছে। আকাশ যদি আর শিবিরের কর্মী না হয়ে থাকেন, তাহলে তার মিছিলের উপস্থিতি কে অনুমোদন দিলো? যেহেতু তিনি পুরনো কর্মী, যেহেতু তার অতীত পরিচয় খোদ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত, সেহেতু সংগঠনের ওপরই প্রাথমিক দায় বর্তায়।
এভাবে রাজনৈতিক সহিংসতা যদি অদৃশ্য ঘাড়ে ঠেলে দেয়া হয়, তাহলে গণতন্ত্রের কাঠামো কোথায় থাকে?
আরও ভয়াবহ প্রশ্ন—তাহলে কি ভবিষ্যতে ছাত্রশিবিরের মিছিল আরও বড় দেখানোর জন্য তারা নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ কিংবা চিহ্নিত জঙ্গি গোষ্ঠীর সদস্যদেরও মিছিলে আমন্ত্রণ জানাবে? যদি মিছিলে কেউ গ্রেনেড ছুঁড়ে দেয়, তাহলে কি তখনও তারা বলবে, সে তো আমাদের কেউ না?
এ আত্মবঞ্চনার রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। রাজনীতিতে কর্মীর অপরাধ হলে সংগঠন দায় নেবে—এ নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা না করলে রাজনীতির প্রতি জনগণের আস্থা ফিরবে না। গণতন্ত্র মানে শুধু ভোটের রাজনীতি নয়; গণতন্ত্র মানে জবাবদিহিতা, দায়িত্ব ও স্বচ্ছতা। দায়িত্ব থেকে পলায়ন করে আর যাই হোক, রাজনীতি করা যায় না।
রাজনৈতিক কর্মীর অপরাধের দায় অবশ্যই রাজনৈতিক দলের ওপর বর্তায়। দলই তাকে মাঠে নামায়, দলই তাকে আদর্শ দেয়, দলই তাকে নির্দেশ দেয়। সে কর্মী যদি আদর্শচ্যুত হয়—তবুও দলের দায় শেষ হয় না। কেননা, তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার দায়ও দলেরই।
সুতরাং, চট্টগ্রামে বাম ছাত্র সংগঠনের নারী কর্মীর ওপর হামলার দায় এড়াতে পারে না ছাত্রশিবির কিংবা জামায়াতে ইসলামী। এ দায় নিতে হবে, দলীয়ভাবে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে, অপরাধীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। আর যদি বাস্তবেই অভিযুক্ত আকাশ এখন আর শিবিরের কেউ না হন, তাহলে তদন্তপূর্বক এ বিষয়টি আদালতের সামনে পেশ করা উচিত এবং একইসঙ্গে ভবিষ্যতে কর্মী বাছাই ও অংশগ্রহণ নিয়েও কড়াকড়ি আরোপ করা উচিত। চট্টগ্রামের ওই ঘটনার দায় জামায়াতকে ও ছাত্রশিবিরকে নিতে হবে কোন 'ইফ', 'বাট' ছাড়াই।
দ্বিমুখী নীতি অর্থাৎ, এক চোখে দেখা রাজনীতি, যখন দলীয় কর্মী মারা যায় তখন চিৎকার করে রাজপথ দখল—আর কর্মী অপরাধ করলেই গা ঢাকা দেয়া—এ চাতুর্যপূর্ণ রাজনীতি এখনই বন্ধ হওয়া দরকার। না হলে রাজনীতি থেকে আদর্শ ও নৈতিকতা চিরতরে হারিয়ে যাবে।
৩০ মে ২০২৫
সম্পাদক




























